পাতাগুড়ি থেকে গোসাবা। বাই কার আধঘন্টার বেশি সময় লাগা উচিত নয়।
স্টেট ট্যুর প্রোগাম অফিসার সেটাই বলেছে সোহমকে। সিকিউরিটির দু’টো
গাড়ির মধ্যিখানে লাল আলো লাগানো ছাইরঙা জেনে চেপে বসে
চুরানব্বই’এর ব্যাচের একমাত্র বাঙালি আই.এ.এস সোহম সেনগুপ্ত।
পেছনের সিটটা জুড়েই শুধু ও। ড্রাইভারের পাশে সাফারি পরা ওর
পার্সোনাল সিকিউরিটি, যার সতর্ক চোখ এখন রাস্তার দু’পাশে।
চব্বিশ ঘন্টা হয়ে গেল সোহমের
ওয়েষ্ট বেঙ্গলে। শেষ পাঁচ বছরে পাঁচ ঘন্টা একটানা ছিল কিনা সন্দেহ
আছে। সকালের ফ্লাইটে এসে বিকেলের ফ্লাইটের দিল্লি ফেরত গেছে।
পরশু সন্ধেবেলাতেই রিলিফ মিনিস্ট্রি থেকে ফোন ভেসে এসেছিল। -
গেট রেডি, বাড্ডি। য়্যু হ্যাঙ অ্যান অ্যাসাইনমেন্ট টু অ্যাকোমপ্লিশ।
ধক্ করে উঠেছিল বুকটা। আনাচে-কানাচে থেকে গুঞ্জন ভাসছিল।
সোহমকেই হয়তো টিমটা লিড করতে হবে। সাউথ বেঙ্গলে একটা ভয়াবহ
ঝড় আছড়ে পড়েছে। আয়লা। সেন্ট্রাল, রিলিফটা ফরওয়ার্ড করার আগে
ক্ষয়ক্ষতিটা কনফার্ম করতে চায়।
- স্যার, সোহমের দৃঢ় স্বর বোধহয় ফোনের ও প্রান্তেও
পৌঁছে গিয়েছিল। রাঙাকাকার বাড়িতে ফোন লাগিয়েছিল রাতেই।
ফোনটা তুলেছিল কাকিমা। গলায় বাড়তি উচ্ছ্বাস ফুটে উঠেছিল সোহমের
ফোন পেয়েই।
- শুভ, কেমন আছিস? সুমনা ঠিক আছে?
(২)
- ভাল, সোহম সংক্ষিপ্তভাবেই সারতে চেয়েছিল।
- আসছিস কবে? কাকিমা শেষ কয়েক বছর একটু বেশি আন্তরিকতা দেখাতে চায়।
- কালই।
- ওঃ মা! সে কীরে! সুমনা আসছে তো?
- না গো। অফিসিয়াল ট্যুর। মিসেস পারমিটেড নয়। ঝড়টা যেখানে হয়েছে, যেতে হবে।
- তাই?
সোহম বুঝতে পারল না, নিজের ছেলের পজিশনটার সাথে সোহমের বর্তমানটা মিলিয়ে নিলেন কি না কাকিমা। বরাবর তুলনা করে এসেছেন।
সোহম আর সুদীপ্ত’র স্কুলে পড়া থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত। সুদীপ্ত এখন স্কুল মাস্টার। সোহম সর্বভারতীয় শাসনতান্ত্রিক বিভাগে।
সরকারী বাংলো, গাড়ি, সিকিউরিটি, চ্যানেলে ইনটারভিউ – সুদীপ্ত'কে
জীবনের দৌড়ে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে সোহম। এখন যদি কেউ ওকে
জিজ্ঞাসা করে, - কেমন আছো? ‘ভালোর’ আগে একটা খুব না বসিয়ে পারে
না।
- তোমাদের ওখান
থেকে একটু ঘুরে যাব ভাবছি। কাকিমা সুযোগ নিতে দেরি করেননি। সোহম আই.এ.এস. হবার আগে কোনওদিন এভাবে বলেছেন কি!
নাকি বাজারওলার ছেলে বলে ---।
- খাওয়াটা এখানেই সারবি কিন্তু।
- সে হবে’খন। ছাড়লাম। নিজের মধ্যে তাড়া আসছিল ফোন ছাড়ার। কখন জরুরী ফোন আসে, বলা যায় না। কাল রাতে রাঙাকাকার বাড়ির রাস্তায় ওর গাড়ি ঢুকতেই আশে-পাশের বাড়ির
জানালা বা ব্যালকনিতে উৎসাহী চোখ-মুখের সারি দেখতে পেয়েছিল। তাও
অনেকদিন পর এ পাড়ায় আসা। ইছাপুর, নবাবগঞ্জের এই এলাকারই ছেলে সোহম। জানেও অনেকে। বেশ কিছু বছর প্রবাসী থাকার পরও। তাছাড়া স্কুটার’এর আওয়াজ আর সঙ্গের নিরাপত্তারক্ষীরা ওকে সাধারণ মানুষের কাছে ভগবানের সমান করে তুলেছে।
নিজের বাড়ির সামনেই গাড়ি দাঁড় করায় সোহম। গেটের
সামনে কাকিমা আর সুদীপ্ত দাঁড়িয়েছিল। হাসি মুখে এগিয়ে এসেছিল।
উল্টোদিকের বাড়িটাই রাঙাকাকার।
নিজের বাড়ির দিকে তাকায় সোহম। বছর বারো
আগেও টালির ছিল। দিল্লি থেকে টাকা পাঠিয়েছিল। রাঙাকাকাই দাঁড়িয়ে
থেকে ঢালাই করিয়ে দিয়েছিল। ফোনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কাকা প্রায়
বিগলিত হয়ে গিয়েছিল। বাড়িটাকে ঘিরে সোহমের হাজার একটা স্মৃতি
আছে। বাবার বাজার বিক্রি। ওর স্কুলে পড়া। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার
মাঝেই বাবাকে হারানো। মা’এর রান্নার কাজ। দাঁতে দাঁতে চিপে পড়াশোনা
আর ইকনমিক্সে ফার্স্টক্লাস। সবাই যখন বলছে টিচারিতে ঢুকতে, তখন সোহমকে মা বাড়ি বন্ধক দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন দিল্লিতে। ইউ.পি.এস.সি পরীক্ষার কোচিং নিতে। সাবাইকে অবাক করে দিয়ে একচান্সে সোহমের আই.এ.এসে চান্স – সব ঘটনাগুলো নিয়ে মালা গাঁথলে রূপকথা মনে হয়।
সোহম যখন কর্ণাটকের ক্যাডার হয়ে ট্রেনিং পিরিয়ডে, তখন মা'কেও বাবা ডেকে নিল। অভাব বা ক্ষিদের মতো শব্দগুলোর শরীরী রূপকে দেখেছে সোহম। তখন কেউ জিজ্ঞাসা করলে মিথ্যে বলতে হতো যে, ও ভাল আছে।
আজ যে সত্যি ভাল আছে গোটা পৃথিবী-কেই ডেকে দেখাতে ইচ্ছে করে।
রাঙাকাকা নেই। মেয়ের কাছে। টুপুর, সোহমের থেকে অনেক ছোট। কিন্তু বিয়ে হয়েছে তাড়াতাড়ি। খেতে বসে কাকার না থাকার আফশোসটা করেও ফেলল সোহম। কাকিমার উত্তরেই
সোহম বুঝতে পারল, ওকে নিয়ে আলোচনাটা একপ্রস্থ
সারা হয়ে গেছে।
- সকালেই ফোন করেছিল। বললাম, তুই আসছিস। বলল, আমি তো আর শুভ’র মতো প্লেন ধরব আর কলকাতায় পৌঁছতে পারব না। শুভ'কে
বোলো, আমি ওকে ফোন করব।
অল্প হাসে সোহম। বাড়িটা ফাঁকা পড়ে থাকলেও সোহম
এখনও বিক্রি করার কথা ভাবেনি। পুরো বাড়িটাই দেখাশোনা করে রাঙাকাকা। বাড়িটার চাবি ওবধি থাকে কাকার কাছেই। কাকার উপর একটা অন্যরকম কৃতজ্ঞতা বোধ করে সোহম। মৃদু গলায় উত্তর দিয়েছিল, আমার মোবাইলেই করতে বোলো। কাকিমা নিজে হাতে রান্না
করেছিল। ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন কষা খেয়ে বেরোতে বেরোতে একটু রাতই হয়ে গিয়েছিল। সরকারী কাজে এসেছে। রাত কাটানোর কথা সার্কিট হাউসে। আজকে অবশ্য খুব ভোরেই বেরিয়ে এসেছে সার্কিট হাউস থেকে।
গাড়ির কাঁচ তোলা।
ভেতরে এসি চলছে। বাইরের তাপের কোনও ছোঁওয়াই পাচ্ছে না সোহম।
গাড়ির ভেতর থেকেই এসেছে সোহম। পাঁচ জনকে ভাগ করে পাঠিয়েছে তিন
জায়গায়। নিজে এসেছে গোসাবার পরিস্থিতি দেখতে। এতক্ষণ এক দেড় কিলোমিটারের মধ্যে দু’তিনটে করে বাড়ির ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ছিল। মহিষপুরের মোড় বেঁকে গাড়িটা কাঁচা রাস্তায় ঢুকতেই সোজা হয়ে
বসল সোহম। সুনামীর সময়ে তামিলনাড়ু যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আসার আগে নিজের ল্যাপটপে সিডার’এর ছবি দেখছিল। এখন মনে হচ্ছে, ঝড় শুধু পশ্চিমের দেশে বয় না, ভারতবর্ষেও বয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বেশি।
এখানে প্রতিরোধ কম, ক্ষয়ক্ষতি বাড়তি।
গাড়ি এগিয়ে চলেছে। গাড়ির কাঁচ নামিয়ে ফেলেছে
সোহম। মাঝে মধ্যে গাড়ি থামিয়ে দু’একটা ফটোস্ন্যাপ নিতে হচ্ছে। ফাইনাল রিপোর্টে ছবি থাকলে মিনিষ্ট্রি বেশি খুশি হয়। কাজের ব্যাপারে কেরিয়ারের শুরু থেকে সোহম খুব সিরিয়াস।
চারিদিকে শুধু জল আর জল। ‘ওয়াটার ওয়াটার এভরি হোয়ার, বাট
নট্ এ্যা ড্রপ টু ডিংক।’ ভি.আই.পি’র গাড়ি দেখে মানুষজন এগিয়ে আসছে।
জলের স্রোতের শব্দ শুনতে পাচ্ছে কোথাও। মানুষের গলার আওয়াজও।
গাড়ি থামতে দরজা খোলে সোহম। সামনে বসে থাকা সিকিউরিটি ওর
দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
- স্যার, ভীষণ মাড্। জুতো-মোজা ভিজে যাবে।
- থ্যাংকস, বাট আই উইল গেট ডাউন।
নেমেও আসে সোহম। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর গায়ে ঠিকমতো জামাকাপড় নেই। মুখের হাসিটা যেন কোথায় মিলিয়ে গেছে।
একসঙ্গে অনেক কিছু বলতে চাইল। এগিয়ে আসতে চাইল। সিকিরিউটি বাধা দিলে সোহম সিকিরিউটিকেই বাধা দেয়।
- আসতে দিন ওদের।
কিন্তু এক এক করে........ খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো, বুকের হাড় আর হাতের শির বের করা লোকটার লুঙ্গিটাও ছেঁড়া।
নিজের বাবার কথা মনে পড়ল সোহমের। লোকটা সামনে এসে দাঁড়ায়। সোহম
প্রশ্ন করে,
- কী অসুবিধা আপনার? খাবার-দাবার পাচ্ছেন ঠিক মতো?
- হ্যাঁ, কিন্তু হ্চ্ছে গে, অন্য অসুবিদে রোয়ে।
- বলুন, সোহম শুনতে চাইছে। - ছেলিটা ইস্কুলি যেতি পেততিচ্ছে না। পোড়াশোনার বড় শখ। বই ভেসি গে,---
সোহম চুপ করে আছে। লোকটা কি আরও কিছু বলবে! কোথা থেকে
কোকিল ডেকে উঠল। নাঃ, কোকিল নয়, রিংটোন। আশেপাশের কারোর
থেকে বেজে উঠেছে। সোহম চোখ তুলে তাকাতেই তড়িঘড়ি বন্ধ হয়।
- আপনার বাড়ি কোথায়, সোহম হালকা করে প্রশ্ন করেছে।
- ঐ টে.......
যে দিকটা নির্দেশ করে সেখানে দৃষ্টিটা নিক্ষেপ করার চেষ্টা করে সোহম। জলে ডোবা জায়গাটা থেকে একটা আমগাছ নজরে আসে। লাল টালির আবছা দু’একটা বাড়ির মাথাও যেন। একইরকম বাড়ি আগে যেন কোথায় দেখেছে। কোথায় যেন.....
সবাইকে চমকে দিয়ে এবার সোহমের নোকিয়ার ই-সেভেনটিটু বেজে উঠেছে। টুপুরের নাম্বার। রিসিভ করতেই ও প্রান্তে রাঙাকাকার গলা ভেসে আসে.....
- শুভ?
রাঙাকাকার স্বরটা কি একটু তেলা লাগছে?
- হ্যাঁ গো, বলো।
- অনেকদিন কথা হয় না। কালকে দেখা হল না। আছিস কেমন?
- আমি?
কী বলবে বুঝতে পারে না প্রথমে সোহম। তারপর গলা
নামিয়ে খুব আস্তে আস্তে বলে ওঠে,
- ভাল না।
দূরের টালির বাড়িগুলো তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।