রবিবার হলেই নিখিলের (বাপি) বাড়িতে বসা। আমি, চিন্তা আর মাঝেমধ্যে জীবন। মাসিমার হাতে চা আর সঙ্গে মানচিত্র আর কাগজ কলম। পরিকল্পনা সাজানো হয়ে গেলো। এবার পূজোর ছুটিতে পিণ্ডারি অভিযান। আমি, চিন্তা আর নিখিল। জীবনের চোখের সমস্য তাই প্রথমেই বাদ। পরে যুক্ত হলো পার্থ ও বিচ্ছু। পার্থ চিন্তার বন্ধু আর পার্থর বন্ধু বিচ্ছু। পার্থর সঙ্গে পূর্বালাপ থাকলেও বিচ্ছু একদম অপরিচিত আমাদের কাছে। একটু কিন্তু কিন্তু থাকলেও ওকে দলে নিলাম সংখ্যায় বাড়তে। তবে ওর নামের যথার্থতা পরে বুঝেছিলাম পদে পদে। নিখিলকে ম্যানেজার করে আমাদের পাঁচজনের টিম। প্রথমে ম্যানেজার হলেও পরে কখন যে ক্যাপ্টেন হয়েগেছে ওর কর্তাব্যক্তি সুলভ হাবভাব আর পুরোনো অলেস্টার আর হ্যাটের গুণে। ইতিমধ্যেই অন্যানা ট্রেকাররাও ওকে ক্যাপ্টেন বলে ডাকতে শুরু করেছে। আজও তিরিশ বছর বাদেও নিখিলকে অনেকেই ক্যাপ্টেন বলেই ডাকে।
অতঃপর যাত্রা শুরু নির্দিষ্ট দিনে। অমৃতসর মেলে লক্ষ্ণৌ পৌঁছে রেলক্যান্টিনে দুপুরের আহার আর আশপাশটা একটু ঘুরে নিয়ে ডিনার সারলাম মটন চাপ আর তন্দুরি রুটি সহযোগে। দামে ভীষণ সস্তা আর স্বাদেও অপূর্ব। আজও যেন মুখে লেগে আছে। তারপর আয়েশবাগ স্টেশনে নৈনিতাল এক্সপ্রেস ধরার জন্যে। সুন্দর ট্রেন। ভালো গতি আছে। ক্রমশ রাত্রি বাড়তে লাগলো সঙ্গে ঠাণ্ডাও। আমরা তখন পাঞ্জাবি টিকিট চেকারের সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত। সত্যিই ভদ্রলোক। বাংলা সম্পর্কে তার উচ্চ ধারণা আর গর্ব একজন অবাঙালির কাছে অপ্রত্যাশিত। তাই, এতো বছর পরেও তার কথা মনে রেখেছি।
অনেকের কাছেই শুনেছি লালকুঁয়ার জিলাপি খুব বিখ্যাত তাই ভোরবেলা ট্রেন লালকুঁয়া পৌঁছতে সেই স্বাদ নিতে ভুললাম না। পরের স্টেশন হলদুয়ানি নামার পালা। তারপর ভাড়ার জিপগাড়িতে হলদুয়ানি থেকে ভারারি। ওখানেই আমাদের রাত্রিবাস। ছোট্ট শহর। একটু ঠাণ্ডাও পড়েছে। সন্ধেবেলা ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম অনেক হোটেলে একধরনের মাছ ভাজা সাজিয়ে রেখেছে। জিজ্ঞেস করতে বললো ট্রাউট মাছ। দু-একজন বাঙালি ট্রেকার বসে খাচ্ছিলো। বললো,'খেয়ে দেখুন অপূর্ব স্বাদ। এরপর তো আর কোথাও মাছ পাবেন না।'
ঐ খানেই প্রথম ট্রাউট মাছের স্বাদ নিয়েছিলাম। সত্যিই ভালো। ওটাই প্রথম আর ওটাই শেষ। পরে আর সুযোগ হয়নি।
(২য় পর্ব)
ভারারি খুব ছোট্ট একটা শহর। গ্ৰাম বললেও অত্ত্যুক্তি হবেনা। এখান থেকেই আমাদের রেশন সংগ্ৰহ করতে হবে ৬-৭ দিনের জন্যে। রেশন বলতে একটু চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি। আমরা বেরিয়ে পড়লাম রেশন সংগ্ৰহে।
আগেই টেলিফোনে যোগাযোগ হয়েছিল, কলকাতা থেকেই চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আমরা পৌঁছাতেই একজন হাজির হলো। যেন আমাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। ২৮-৩০ বছরের ছোটখাটো দোহারা চেহারার এক যুবক একগাল হেসে পরিচয় দিলো নিজেকে আমাদের বুক করা গাইডের প্রতিনিধি হিসেবে। পূর্বনির্ধারিত ব্যক্তি, যার সঙ্গে আমাদের পত্রালাপ হয়েছিল, আসতে পারবে না অন্য একটা বড়ো ট্রিপ থাকায়। তার বদলে তাকেই পাঠিয়েছে। আমাদেরও বিস্রান সিং কে পছন্দ হয়ে গেল ওর সদা হাস্যময় মুখ দেখে। পরবর্তী কালে ওই ছয় সাত দিন ও আমাদের বন্ধু হয়ে উঠলো ওর আন্তরিকতার গুণে।
সেপ্টেম্বরের শেষদিকে সবে ঠাণ্ডা পড়ছে। বেশ উপভোগ্য। টুকিটাকি কেনাকাটা সেরে রাতের খাবার খেয়ে আমরা তাড়াতাড়ি বিছানায় গড়িয়ে পড়লাম। আড়াই দিনের ট্রেন জার্নি তার উপর আগামীকাল সকাল সকাল বেরুতে হবে। বিস্রান ও বিদায় নিয়েছে ভোরবেলা আসবে বলে।
যাতায়াত নিয়ে মোট নব্বই কিলোমিটার পথ।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা সবাই প্রস্তুত। একমাত্র পার্থ ছাড়া। ওকে ডেকে তুলতে হলো।
বিস্রান ও হাজির। বেশ রোমাঞ্চ লাগছে। আমার ও বাপির দু একটা ছোটখাটো ট্রেকের অভিজ্ঞতা থাকলেও বাকিরা একদম নতুন।
ঠিক ছিল প্রথমে লোহারক্ষেত হয়ে ঢাকুরি যাব। ওখানেই রাত্রিবাস। পরিবর্তন করে আরো একটা দিন বাড়িয়ে নিলাম দলের অবস্থা বিবেচনা করে।
লোহারক্ষেতেও নয় ফেরার পথে স্টে আছে বলে আমরা সাং এই রাত্রিবাস করবো ঠিক করলাম।
মাত্র কয়েক কিলোমিটার রাস্তা ক্রমশ চড়াই ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বুঝলাম সবাই সহজ বা বিগিনার্স ট্রেক বললেও এতোটা সহজ নয় সেটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে শুরু করলাম।
এবড়ো খেবড়ো পাথুরে রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম রাস্তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে।
রাস্তার দুধারে ইতস্তত ছড়ান ছিটানো গ্ৰাম। চতুর্দিকে সবুজের সমারোহ। মিঠেকড়া রোদ আর মাঝেমধ্যেই নন্দাদেবী, নন্দাকোটের উপর ছিটকে পড়া সূর্যালোকের নয়নাভিরাম দৃশ্য পথের ক্লান্তি ভোলাচ্ছে। দেখতে দেখতে আমরা প্রথম দিনের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেলাম। একটা চাতালের মতো ঘেরা অংশে ট্রেকার্স হাটে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। বেশ চড়া রোদ্দুর মাথায় উপর। তল্পিতল্পা কাঁধ থেকে নামিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম পাইপের মাধ্যমে ঝর্ণার জল আনার ব্যবস্থা রয়েছে। কয়েকজন রোদ্দুরে তেল মেখে বসে আছে স্মান করবে বলে। দেখে আমারও ভীষণ ইচ্ছে করছে তিন দিন স্মান না করা শরীরটাকে একটু ভিজিয়ে নিতে। ধরচূঢ়া ছেড়ে আমিও সামিল ওদের সঙ্গে। সঙ্গে করে আনা সর্ষের তেল ভালো করে মেখে রোদ্দুরে গা গরম করতে বসলাম আর বন্ধু দু-এক জনের আপত্তি সত্ত্বেও গায়ে জল ঢালতেই ওরে ব্বাপ কি ঠাণ্ডা!
(৩য় পর্ব)
সকাল বেরিয়ে পড়লাম। সবার পিঠে রাক স্যাক। লোহারক্ষেত হয়ে ঢাকুরি টপ (২৬৮০মি.)। ১৩-১৪ কিমি রাস্তা। লোহারক্ষেত থেকেই ১১ কিলোমিটার। অভিজ্ঞরা বলেছিলেন ট্রেকিংয়ের এই অংশটা খুব চড়াই। ঢাকুরি টপ পেরিয়ে গেলেই পিণ্ডারি খুব সহজেই পৌঁছানো যাবে।
গ্ৰামের মধ্যেদিয়ে রাস্তা। রাস্তার ধারে ছোট ছোট ফুটফুটে বাচ্চাদের দাঁড়িয়ে অবাক চোখে আমাদের দেখা অথবা স্কুলে যাবার পথে হাতনাড়া এক অতিপরিচিত ও নয়নাভিরাম দৃশ্য। আমরা প্রত্যেকেই পকেট ভর্তি লজেন্স নিয়েছিলাম। গলা শুকিয়ে গেলে কাজে দেবে। দু-একটা ওদের দিকে ছুঁড়ে দিতে কি আনন্দ! যারা পায়নি তারা বললো, 'মিঠাই দে'। আবার এক আধটা ঝোপে পড়ে গেলে খোঁজার কি প্রাণান্তকর চেষ্টা। আনন্দের মাঝেও মনটা বিষাদগ্ৰস্থ হয়ে পড়লো ওদের এই সামান্য চাহিদাটুকু দেখে। মনে হয় যদি----, থাক। চলো ফিরে যাই নিজ পথে।
এক ঘন্টা হাঁটার পর লোহার ক্ষেত(১৭০৮ মি) পৌঁছে গেলাম। একটু বিশ্রাম, চা পান তারপর পথচলা। সামনে নন্দাদেবি আর নন্দাকোট আমাদের পথ চেনাচ্ছে। মাঝে মধ্যে পিণ্ডারীর ক্ষীণধারা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। আবার হারিয়েও বাচ্ছে। চারিদিকে হরিদ্রাবর্ণ আর নাম না জানা ফুল সঙ্গে পাখির কুজন আমাদের শহুরে মনে ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করেছে। সত্যি প্রকৃতি কি অপরূপ!
পার্থ একটা ছোট্ট রেকর্ডপ্লেয়ার চালিয়ে মনের আনন্দে শিষ দিতে দিতে হাঁটছে। এটাই ওর প্রথমবার ট্রেকিং। আমরা ওর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, 'বুঝবে খুড়ো বেলা হলে!'
রাস্তা ক্রমশঃ চড়াই হচ্ছে। বেশ কষ্টকরও। হাঁটার গতিও কমে আসছে। ইতিমধ্যেই অর্ধেক রাস্তা পেরিয়ে এসেছি। সামনে পড়লো ঢাকুরি খাল(২৫৪০ মি.)। পারাপারের জন্যে একটা রডোডেনড্রনের বিরাটাকার কাণ্ড একমাত্র উপায়। কোন সাপোর্ট নেই। অনেকটা নীচে ক্ষীণ জলধারা। দেখে মাথা ঘুরে গেল। ভাবলাম যাত্রাপথের এখানেই ইতি। আমাদের সাহস দিতে কয়েকটি অল্পবয়সী ছেলে অবলীলাক্রমে পেরিয়ে গেল। দু-এক জন আবার ফিরেও এলো। আমরাও সাহস করে বিস্রান সিং এর সাহায্যে একে একে পেরিয়ে গেলাম। পরে জেনেছি ওই ছেলেগুলো হাওড়া থেকে এসেছে। আরো পরে জেনেছি কোন একটা অভিযানে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে হারিয়ে যায়।
রাস্তায় আমাদের দল বাড়তে লাগলো। বসন্ত বসু (ওকে সবাই বাসু বলেই ডাকে) আর সন্দীপ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। এখন আমরা সাত জন।
রাস্তার ধারে ওক আর রডোডেনড্রনের আধিক্য।
এটা ফুলের সময় নয়। কিন্তু বিশাল বিশাল ঋজু গাছ যেন আমাদের ব্যারিকেড করে দাঁড়িয়ে।
চড়াই ভেঙ্গে এগুতে এগুতে আমরা সবাই শ্রান্ত। পার্থর আনন্দ এখন ক্রন্দনে পরিণত প্রায়। ওকে এই কষ্টের বিষয়টা না জানিয়ে নিয়ে আসার জন্যে আমাদের দোষী করে গালিগালাজ করছে।
এদিকে ক্ষিদেও পেয়েছে। শুকনো খাবার আর লজেন্স মুখে নিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে। যদিও বুঝতে পারলাম প্রায় এসে গেছি কিন্তু পা আর চলছে না। দম ও শেষ। মনে হচ্ছে আর পারবো না। মনে পড়লো একজন বলেছিলেন যখন দেখবে আর পারছো না তখনই ঠিক পৌঁছে গেছো। মনে মনে এই কথাটা স্মরণ করে শেষ কয়েকশো মিটার এগিয়ে চললাম হামাগুড়ি দিয়ে। মাথা নিচুতে নেমে গেছে। কোনক্রমে মাথা তুলে দেখি একি, স্বপ্ন দেখছি নাকি? কোথায় ক্লান্তি! সামনেই এক প্রশস্ত সবুজ চাতাল আর তার ওপারে আমাদের স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে শ্বেতশুভ্র চৌখাম্বা (আমার মতে গাড়োয়াল কুমায়ূন রেঞ্জের সবচাইতে সুন্দর ও উজ্জ্বল চূড়া)।
নিমেষেই সব ক্লান্ত শেষ। আমরা চতুর্দিকে সুউচ্চ চূড়ায় ঘেরা এই সবুজ উপত্যাকাকে উপভোগ করতে করতে তাঁবুতে প্রবেশ করলাম। বিস্রান রান্নার জোগাড়ে ব্যস্ত। অনেকগুলো দল এসেছে। আমরা ঠিক করলাম একসঙ্গেই রান্না হবে। তাতে শ্রম ও জ্বালানির সাশ্রয়। সবাই হাত লাগাতে রান্নাও হলে গেল তাড়াতাড়ি। রান্না বলতে খিচুড়ি আর আলু মরিচ। এদিকে পেটেও ছুঁচোর ডনবৈঠক। আর তর সইছে না। খেতে বসার আগে মনে পড়লো আমাদের কাছে পাঁপড় আছে। বের করতেই সঙ্গে সঙ্গেই সেঁকে চলে এলো।
সবাই যখন খাচ্ছি একজন বললো আমার কাছে মাখন আছে। আমাদের জীবনের অন্যতম একটি সুন্দর বনভোজন ইত্যবসরে হয়ে গেলো।
নন্দাদেবি, নন্দাকোট আরো অনেক অনেক অজানা পর্বতশৃঙ্গ বিশেষ করে চৌখাম্বার দিকে
তাকিয়ে থাকতে সন্ধ্যা নেমে এলো। সূর্যাস্তের আলোকচ্ছটায় চূড়াগুলি হয়ে উঠেছে রক্তিম।
এক সর্গীয় দৃশ্য। সারাটাজীবন স্মৃতিতে ধরে রাখার মতো।
আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা বাড়ছে। আমরা তাঁবুতে আশ্রয় নিলাম। ভিনার রেডি। বিস্রান জানিয়ে গেল। নিখিলকে দেখলাম বাইরে যাবার জন্যে উসখুস করছে। আমারও ইচ্ছেটা চাগান দিলো। আস্তে আস্তে দুজনে তাঁবুর বাইরে এলাম। বেশ ঠাণ্ডা। পূর্ণীমার রাত। আমরা চাকুরিতে কোজাগরী পূর্ণিমা কাটাবার প্ল্যান আগের করেছিলাম। আকাশ জুড়ে চাঁদ উঠেছে। পরিস্কার আকাশ। পাহাড়চূড়ায় ঠিকরে পড়া চন্দ্রালোকের এই শোভা ইহজীবনে ভুলবো না। আমরা সন্মোহিত। লক্ষ্য করলাম নিখিল গ্ল্যাভস ও মাঙ্কি ক্যাপ খুলছে। ওর মতো অ-কবিরও এই কাব্যিক রূপ আমাকেও প্রভাবিত করলো। বললো, চ' আমরা হ্যাটস অফ জানাই প্রকৃতিকে!' আমি নিখিলকে অনুসরণ করলাম। কতক্ষণ এই অবস্থায় ছিলাম জানিনা। সম্বিত ফিরলো অন্যদের বকাঝকায়।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরে এলাম তাঁবুতে।
(৪র্থ পর্ব)
এবার বেশ কিছুটা উৎরাই তার পর প্রায় সমতল পায়ে চলা রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চললাম খাতির (২২১০ মি.) দিকে। অনেকটা রাস্তা হলেও এই পর্যায়ে সবচেয়ে সুন্দর বৈচিত্র্যময় যাত্রা। রাস্তার দুধারে পাহাড়ের গা বেয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ওক, রডোডেনড্রন আর মাঝেমধ্যে নানা ধরণের ফসলের ক্ষেত। হয়ে আছে নানা বর্ণের সবজি।
বোঝাযায় আশেপাশে মানুষের বসতি আছে। দেখাও যাচ্ছে দু-একটি বাড়ি দুরে দুরে একটু ছাড়া ছাড়া অবস্থায়। অনেক নীচু দিয়ে পিণ্ডারি ও সুন্দরডোঙ্গা নদী তিরতির করে বয়ে চলেছে। রাস্তায় পড়ছে অসংখ্য ঝর্ণা। অতিক্রম করে আমরা এগিয়ে চলেছি গন্তব্যের দিকে। দ্বিপ্রহরিক আহার সারা হলো এমন একটি ঝোরার ধারে। ক্ষণিক বিশ্রাম নিয়ে আবার পথ চলা। চলতে চলতে অন্যেরা এগিয়ে গেছে দেখে আমি চেষ্টা করলাম পাকদণ্ডী বেয়ে ওদের নাগালে পৌঁছতে আর ওখানেই করে ফেললাম এক মারাত্মক ভুল। দেখলাম রাস্তাটা অবরুদ্ধ একটা বড়ো গর্তের মতো থাকায়। এপাশ ওপাশ তাকিয়ে কোন উপায় না দেখে ভাবলাম এটা পেরিয়ে গেলেই রাস্তা মিলবে। যা ভাবা তাই-
একটা পাথরে পীঠ রেখে নেবে পড়েই চক্ষু চড়কগাছ। বেরুবার রাস্তা নেই। কারো সাহায্য ছাড়া বেরোতেও পারবোনা। খুব ভয় পেয়ে গেলাম। সবাইতো এগিয়ে গেছে কে উদ্ধার করবে আমায়। দুএকবার পাথর বেয়ে ওঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। এক্ষেত্রে রক ক্লায়িম্বিং এর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যর্থ। অগত্যা অন্য উপায় খোঁজার চেষ্টা। দেখলাম একটি সুড়ঙ্গের মতো রয়েছে। ওপারে আলো দেখা যাচ্ছে। হয়ত পশুপাখিদের যাতায়াতের রাস্তা। আর কোন উপায় না দেখে বুকে হেঁটে ইষ্টনাম জপ করতে করতে পেরিয়ে গেলাম ওই সুড়ঙ্গ। না, এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম।
সামনে জঙ্গলের পথ আর আমি প্রায় একা হয়ে পড়েছি। সঙ্গীরা নিশ্চয়ই অনেকটা এগিয়ে গেছে। দেখলাম আমার মতোই ধীর গতিতে দুজন আসছেন। ওনারাও দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। কলকাতায় থাকেন, স্কুল শিক্ষক। আমাকে দেখে বললেন, 'ভালোই হলো আপনাকে পেয়ে। জানেন তো এই পথে খুব ভালুকের উপদ্রব?' আমি মনে মনে বললাম, 'ব্যাটা ভালুকের হাত থেকে বাঁচতে আমায় সঙ্গী চায়!'
রাস্তায় এই প্রথম আঞ্চলিক মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো। মা আর সঙ্গে অষ্টাদশী কি দ্বাবিংশতি কন্যা। আলাপ করার লোভ সামলাতে পারলাম না। পকেট থেকে লজেন্স বের করে দিতে গিয়ে দেখলাম কন্যার সলজ্জ চাউনিতে বিদ্যুৎ ঝলক। কালো হরিণীর মতো চোখ। রোদেপোড়া শ্যাম বর্ণ, দীর্ঘাঙ্গী, মেদহীন চেহারায় এক দুর্ণীবার আকর্ষণ, মাটির গন্ধ মাখা। প্রেমে পড়ে গেলাম।
হৃদয় বললো, 'এখানেই বাঁধো নীড় ক্লান্ত পথিক, এইতো তোমার শ্যামা!'
কিন্তু যা হবার নয় তাই নিয়ে ভেবে লাভ কি? জিজ্ঞেস করলাম রাস্তায় কোথাও চা পাওয়া যাবে কিনা? বয়স্কা বললেন সামনেই আছে। তারাও ওই দিকে হয়েই যাবে। কিছুটা এগোতেই পথের ধারে চায়ের দোকান। দেখিয়ে দিয়ে চলে যেতে চাইলে আমি ওদের আমাদের সঙ্গী হতে বললাম। নিমরাজি হয়েও একসাথে চা খাওয়ার পর ওরা উঠে পড়লো। হাত নেড়ে বিদায় নিয়ে আস্তে আস্তে দৃষ্টির অগোচরে চলে গেল। আমার চোখ ওদের যাত্রাপথের দিকে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি উঠে পড়লাম দুই অতিথিকে সঙ্গী করে। বরুনদেব অস্তমিত প্রায়। পাখিরা ক্লান্ত হয়ে নীড়ে ফিরছে। চারিদিকে বিহঙ্গের কুজন। পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসা রূপালী ধারার নয়নাভিরাম দৃশ্য আমাদের চলার গতিকে আরো স্লথ করে তুলেছে। হোক না বিলম্ব এই দৃশ্য কি বারবার কপালে জোটে!
আর নতুন সঙ্গীদ্বয় ভালুকাতঙ্কে আমার কাছছাড়া হচ্ছেনা। ওদের এই আচরণ বেশ উপভোগ্য লাগছে।
পথে হলো দেরি। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। এবার একটু গা ছমছম ভাব। ভাবছি টর্চের আলোয় পথ চিনতে ভুল হবে না তো? হঠাৎ দেখি অন্ধকার ফুঁড়ে সাক্ষাৎ দেবদূতের মতো বিস্রান হাজির। আমার দেরি হচ্ছে দেখে ও অন্যদের ছেড়ে দিয়ে আমায় নিতে এসেছে। মনটা ভরে গেল। কলকাতা থেকে এই সুদুর উত্তরাখণ্ডের প্রত্যন্ত প্রান্তে এসে যেন পরম আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা। সত্যিই ওরা কত আন্তরিক!
অন্যেরা অনেক আগে পৌঁছে গেছে। সবার আগে চিন্তা (বিশ্বজিৎ) লম্বা লম্বা পা ফেলে পৌঁছে গেছে এবং ট্রেকার্স হাটে এসে জায়গা বুক করেছে। আমায় দেখে ঝাঁঝিয়ে উঠলো, 'কিরে এতক্ষণ ধরে কি করছিলি? আমি কখন সেই তিনটের সময় এসে গিয়েছি। এখন ঘড়ি দেখ সাতটা বেজে গেছে।'
আমি মেনে নিলাম। রাস্তার কথা বলা যাবেনা। চিন্তা আমার পাড়ার ছেলে। চর্তুদিকে রাষ্ট্র হয়ে যাবে!
(৫-ম পর্ব)
আজ একটু দেরি করে বেরুবো। চিন্তার রাতে জ্বর হয়েছে। মনে হয় রাস্তায় অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করার জন্যে। আমি একটু গতকালের বদলা নিয়ে নিলাম। বললাম, 'এখানে কোন প্রতিযোগিতায় আসিনি, প্রকৃতিকে উপভোগ করতে এসেছি। স্লো বাট স্টেডি।'
ট্রেকার্সহাটটি বেশ সুন্দর। দোতলা কাঠের বাড়ি। আশেপাশে বেশ কিছু বাড়ি ঘরদোর, দোকানপাট আছে। খুব সুন্দর সাজানো গোছানো গ্ৰাম। হিমালয়ের এতোটা গভীরে ভাবা যায়না। এই সুযোগে আশপাশটা একটু ঘুরে ফিরে নিলাম।
আজকের আমাদের গন্তব্য ফুরকিয়া ভায়া দোয়ালি। খাতির থেকে দোয়ালি ৮ কিমি আর দোয়ালি থেকে ফুরকিয়া ৫ কিমি পথ। অর্থাৎ মোট ১৩, কিমি পথ।
বেরুবার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে প্রথমেই বিপাক। পার্থ ভুল করে আমার ইনার পরে বসে আছে। ওরটা ভিজে। অগত্যা বিকল্প ব্যবস্থা।
শুরু হলো আজকের অভিযান। বেশ সহজ যাত্রাপথ। শুরু থেকেই আমাদের যাত্রাপথের সঙ্গী খরস্রোতা পিণ্ডার। এই নদী পিণ্ডারি হিমবাহে উৎপন্ন হয়ে কর্ণপ্রয়াগে অলকানন্দার সঙ্গে মিশেছে। রাস্তায় অসংখ্য ঝর্ণা পেরুতে হয় খুব সাবধানে। না হলে বিপদ আছে। দেখতে দেখতে একটা প্রশস্ত জায়গায় পৌঁছে দুপুরের আহারের জোগাড়। সামনে খাড়া একটা বিরাট পাহাড়। এটাকেই টপকাতে হবে! বুকটা দুরুদুরু করে উঠলো। পারবো তো? না শুধু ওই পাহাড়টাই নয় পরে আর একটা পাহাড় ও টপকাতে হলো। পৌঁছে গেলাম দোয়ালি। খুব ছোট্ট একটা ঢালের মতো জায়গা। এখান থেকে কাফনি হিমবাহ (৩৬৬০ মি.) ট্রেকিং শুরু হয়। ফেরার সময় এখানে থাকবো বলে দোয়ালি ছাড়িয়ে এগিয়ে চললাম ফুরকিয়ার দিকে। ওখানেই রাত্রিবাস। সঙ্গী পিণ্ডার আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্বেতশুভ্র নন্দাখাত(৬৫৪৫মি.)
এছাড়া সারা রাস্তা আমাদের সঙ্গী গোলাপী রডোডেনড্রন (অবশ্য এখন ফুলের সময় নয়)। যত উপরে উঠছি ততই রুক্ষতা বাড়ছে। গাছও বিরল হতে লাগলো।
পড়ন্ত বিকালে আমরা ফুরকিয়া (৩২৬০মি.) পৌঁছে গেলাম। প্রথমেই আমাদের আজকের আস্থানা পি.ডব্লিউ.ডি-র পুরোনো কাঠের বাংলো। বাংলো না বলে বিশাল একটা হলঘর বললেই হয়। কাঠের মেঝেতে ঢালাও শোবার ব্যবস্থা। আর দেখার মতো একটা বড়ো ফায়ারপ্লেস আছে। মালপত্র রেখে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বিস্রান প্রাণান্তকর চেষ্টায় আগুন জ্বালিয়ে চায়ের ব্যবস্থ্যা করত মগ্ন। ইত্যবসরে গোধূলির আলোয় প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি কে চোখ ভরে দেখে নেওয়া। অনেকগুলো ছয় হাজার মি. অধিক উচ্চতার শৃঙ্গ যেমন নন্দাদেবী পূর্ব (৭৪৩৪মি.), নন্দাখাত (৬৬১১মি.) বলজুরি(৫৯২২মি.), মাইকতোলি (৬৮০৩ মি.), পাওয়ালি দোওয়ার (৬৬৬৩মি.) সম্মুখে দৃশ্যমান হয়ে এক স্বপ্নের জগত সৃষ্টি করেছে। গোধূলির রং পাহাড় চূড়ায় প্রতিফলিত হয়ে এক স্বর্ণাভ বর্ণছটায় ভরিয়ে দিয়েছে। এই অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করতে করতে গরম চা চলে এলো। আমাদের সকলের হাতে ধূম্রউদ্গারিত গরম চা আর ঝুরিভাজা (বাপি আর পার্থর খাতি থেকে সংগ্ৰহ করে আনা)। উল্লেখযোগ্য এই কদিন আকাশ একদম পরিষ্কার, একদিনও প্রকৃতি বিরূপ হয়নি। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্ধকার নেমে আসছে। ঠাণ্ডাও কামড় বসাচ্ছে। আমরা হাটে ঢুকে গেলাম। আগামীকাল খুব ভোর ভোর বেরোতে হবে বলে রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে আমরা স্লিপিং ব্যাগে আশ্রয় নিলাম। রাত্রে পারদ হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেলো। একে অক্সিজেনের ঘাটতি তার উপর ফায়ারপ্লেস চালু। বেশ কষ্টকর রাত।
শ্বাসকষ্টের মধ্যেই আগামীকালের স্বপ্নে রাত পেরিয়ে গেল।
সূ্র্য ওঠার আগেই আমরা রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ৫ কিমি রাস্তা পুরোটা চড়াই। অবশ্য অর্ধেক রাস্তা পেরুতেই পাইলট বাবার আশ্রম। আশ্রম বললে ভুল হবে। কতকগুলো পাথর সাজিয়ে একটা গুহার মতো। কথিত আছে কোন একজন পাইলট নাকি শেষ জীবনে সাধু হয়ে এখানে স্থান নেয়। পিণ্ডারি অভিমানে আসা ট্রেকারদের একটু পরিসেবা দেওয়া ছিলো ওনার লক্ষ্য। উনি মারা যাবার পরেও ওনার শিষ্যরা এই পরিসেবা অব্যাহত রেখেছেন। যাইহোক ওখানে আমাদের গরম চা মিললো। একটি অল্পবয়সী ছেলে এখন আশ্রমের দায়িত্বে। সেই আমাদের পাথরের বাটিতে চা দিল। বিনিময়ে কিছু দিতে গেলে প্রত্যাখ্যান করলো। সেবার বিনিময়ে কিছু নেওয়া বাবার নিষেধ আছে। অনোন্যপায় হয়ে চূড়ান্ত নাস্তিক বাপি একটা পাথরের গায়ে খোদাই করা মূর্তির সামনে প্রণামি হিসেবে কিছু টাকা রেখে পাথর চাপা দিয়ে বললো, 'কিছু দিতে হলে এদেরকে দিতে হয়। এরা নিঃস্বার্থ ভাবে মানুষের সেবা করে। এতটা উচ্চতায় জনমানবহীন প্রান্তরে এই ত্যাগ, ভাবা যায়!'
রাত্রের পড়া বরফ এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পথে। সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। এমনি একটা খরস্রোতা ঝোরা পেরুতে গিয়ে পাথরের উপর বরফের আস্তারণে পা হড়কে চিন্তা চিৎপটাং। অবশ্য পিঠে রাকস্যাক থাকায় এ যাত্রায় রক্ষা পেলো। আঘাতটা ওটার উপর দিয়েই গেলো।
পৌঁছে গেলাম পিণ্ডারি হিমবাহের (৩৬৬০ মি.) লেজের কাছে অর্থাৎ '০' পয়েন্টে। তিন কিলোমিটার লম্বা আর ৩৬৫ মি. চওড়া হিমবাহটি অশ্বখুরাকৃতি। নীচে পিণ্ডার নদীর উৎসমুখ পরিলক্ষিত হচ্ছে। পূর্ব উল্লিখিত পর্বত ছাড়াও ছাঙ্গুচ (৬৩২২ মি.), ছোট ছাঙ্গুচ হিমবাহটিকে বেষ্টন করে আছে। বিরল এই ভয়ঙ্কর সুন্দর প্রকৃতির রূপে আমরা সন্মোহিত। সম্বিত ফিরলো ক্যাপ্টেন ওরফে নিখিল ওরফে বাপিকে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যেতে দেখে। খুবই বিপদসংকুল ঢালের উপরদিয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে নীচু হয়ে পর্যবেক্ষণ করে ও ফিরে এলো। ফিরে এসে বললো একবারইতো আসা তাই পিণ্ডার নদীর উৎসমুখটা একটু ভালো করে দেখে নেওয়া!
(৬ষ্ট ও শেষ পর্ব)
ঘুটঘুটে অন্ধকারে কুপীর আলোয় প্রায় না দেখতে পাওয়া কলাইয়ের থালায় রুটি আর দুম্বার মাংস। এই ছিলো সেই রাতের পরম উপাদেয় ডিনার। কে যেন খবর এনেছে একটা দুম্বার মাংস কাটা হয়েছে। সব ট্রেকারদের রাতের নেমতন্ন সামান্য মূল্যের বিনিময়ে। ভাঙাচোরা একটা খোলার চালের আচ্ছাদন। এটাই হোটেল এখানেই রাতে খাবারের ব্যবস্থা।
পিণ্ডারিকে আলবিদা জানিয়ে ফিরে আসা দোয়ালি (২৫৭৫ মি.) তে। ফেরার পথে আজ এখানেই আমাদের রাত্রিবাস। ট্রেকার্সহাটে জায়গা মিললো না। মন্দের ভালো একটু দুরবর্তী তাঁবুতে সংকুলান। আসার সময় খাতিতে ছিলাম তাই ফেরার সময় দোয়ালিতে।
সবাই খূব উৎসাহী অনেকদিন বাদে আমিষ জুটবে। ব্যতিক্রমী আমি কারণ মাংস কোনদিনও আমার পছন্দের খাদ্য নয়। বরঞ্চ একটু ঘেন্না ঘেন্না করে খাওয়া। খেতে গিয়ে আজকেও ঘেন্না করতে লাগলো। শুনেছি দুম্বার পিছনের অংশের বৃদ্ধি কেটে নিয়ে রান্না করা হয়। খেতে খুব সুস্বাদু। যাইহোক আমি খাচ্ছি না দেখে একজন বলে উঠলো, 'কি হলো আপনি খাচ্ছেন না যে?' আমি খাবোনা বলতেই ছোঁ মেরে আমার পাত থেকে মাংসের অবশিষ্টটা চালান করে দিল নিজের পাতে। অন্ধকারেও চিনতে পারলাম। সেই দুজন স্কুল শিক্ষক, ঢাকুরি থেকে খাতি যাবার সময় ভাল্লুকের ভয়ে একবারও আমার সঙ্গ ছাড়েনি!
ভোরবলা ওঠা ও সারাদিন হাঁটার ফলে সবাই প্ররিশ্রান্ত ছিলাম। শ্লিপিং ব্যাগে ঢুকে শুয়ে পড়লাম। ঘুমিয়েও পড়লাম অচিরেই। হঠাৎ মাঝরাতে এক ভয়ংকর ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। চতুর্দিকে এক গুম গুম বিকট শব্দ। সমস্ত কিছু যেন ওলোটপালট হয়ে যাচ্ছে। কি হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছি না। একবার ভাবলাম ভাল্লুক ঢুকেছে। পাহাড়ী ভাল্লুক বড় ভয়ংকর। পরে মুহুর্তে মনে হলো না, চিন্তার অল্টিচ্যুভ সিকনেস থেকে জ্বর এসেছে মনে হয়। ওই বোধহয় কাঁপছে বলে তাঁবুটাও কাঁপছে। পরক্ষনেই মনে হলো নিখিল মাঝখানে শুয়েছে। ওর খাটো উচ্চতার জন্যে খুঁটিতে পা লেগে তাঁবুটা এতো কাঁপছে। বাইরে একসঙ্গে হাজারটা বোমা ফাটার আওয়াজ ক্রমশ বাড়ছে। টর্চটাও কোথায় খুঁজে না পেয়ে একে একে সবার নাম ধরে ডাকলাম। কোন সাড়া নেই। অতঃপর আমাদের পোর্টার কাম গাইড বিস্রান সিং এর নাম ধরে চিৎকার করে উঠলাম "বিস্রান এ ক্যা হো রহা"হ্যায়?" দুর থেকে অস্পষ্ট উত্তর ভেসে এলো,"ভূকম্পন"।
ভয়ে, আতংকিত দিশেহারা হয়ে মনে হলো ছুট লাগাই। পরক্ষনেই মনে হলো কোথায় যাব? বিপদ তো সর্বগ্ৰাসী! পাহাড়টার যদি ধ্বসে যায় নিরাপদ আশ্রয় কোথায়? ভাবলাম দৌড় ঝাঁপ করে লাভ নেই তাতে বিপদ আরো বাড়বে। অন্ধকারে কোথায়ইবা যাবো? চর্তুদিকে খাদ।
অন্যথায় বিশাল বিশাল রডোডেনড্রন চাপা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। বনঞ্চ, তাঁবুর অবস্থানও হয় অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায়। তাহলে ভাগ্যে যদি থাকে মৃত্যু কে আলিঙ্গন করে নেওয়া ভালো। একটা প্রশান্তি নেমে এলো মনে। আমার প্রিয়জন সবাই একে একে ভেসে উঠলো চোখের সামনে। মা, বাবা, ভাই বোন বন্ধুবান্ধবদের কাছে বিদায় নিলাম।
"বিদায়! চললো তোমাদের এই অবাধ্য ছেলে"।
শ্লিপিং ব্যাগে নিজেকে ভালো করে ঢুকিয়ে চেন আটকে দিলাম। নাকটুকু খোলা রাখলাম যাতে দমবদ্ধ অবস্থায় মরতে না হয়! তারপর এক গভীর ঘুমে ঢলে পড়লাম।
পরদিন ঘুম ভাঙলো মুখে সূর্যের আলো পড়ে। আস্তে আস্তে চোখ খুললাম। দেখলাম আমি খোলা আকাশের নিচে। তাঁবু উধাও। আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে চেনা পরিচিত অনেকগুলো মুখ। আমি ধড়ফড় করে উঠে বসতে চাইলাম। তখনি চারিদিক থেকে আওয়াজ উঠলো "বেঁচে আছে! বেঁচে আছে!"
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম 'কেন? কি হয়েছিল?"
সঙ্গীরা সবাই মিলে ধমকে উঠলো, "তুই কি করছিস?"
বললাম, "ঘুমোচ্ছিলাম তো!"
আবার ধমক, "ঘুমোচ্ছিলি! সারারাত আমাদের হার্টফেল হবার জোগাড় আর তুই ঘুমোচ্ছিস, তাকিয়ে দেখ তুই কোথায় শুয়ে আছিস! তুই কি মানুষ না অন্য কিছু?"
তাকিয়ে দেখি কি সর্বনাশ! আমি যেখানে শুয়ে আছি তার দেড় দু'হাত দুর থেকে পাহাড়টাই নেই আর আমি শুয়ে আছি একদম কিনারায়!
পরে শুনেছিলাম বাপিও নাকি ঘুমিয়ে পড়েছিল।
আজকের কাফনি হিমবাহ অভিযান বাতিল করতে হলো গতকালের মারাত্মক ভূমিকম্পের পর। অগত্যা নেমে যাওয়া। রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। বিভিন্ন জায়গায় পায়ে চলার পথটুকুও প্রায় নেই বললেই চলে। ভীষণ বিপদসংকুল হয়ে উঠেছে। ক্যাপ্টেন আর চিন্তা অনেকটা এগিয়ে গেছে। মাঝে পার্থ ও বিচ্ছু দেওয়াল ধরে ফেলেছে। অর্থাৎ, পাহাড়ের গা ঘেঁষে কোন রকমে এগুচ্ছে। গোদের উপর বিষ ফোঁড়া পার্থর জুতো ছিঁড়ে গেছে। অন্যদের সাহায্য নিয়ে কোন ভাবে চালাচ্ছিল। ওদের পিছনে আমি আমার পিছনে বাসু ও সন্দীপ। আরো পিছনে বিস্রান সিং সবার বাড়তি বোঝা ওর ঘাড়ে। বেচারা বিশাল ভার নিয়ে ধীরে ধীরে আসছে। অনুভব করলাম এই অবস্থায় ওরা বিশেষ করে পার্থ কিছুতেই যেতে পারবে না। আবার ওদের জন্যে অন্য ট্রেকাররাও আটকে পড়েছে, এগুতে পারছে না। অনোন্যপায় হয়ে ওদের সাহস জোগাতে ট্রেকিংয়ের নিয়মবহির্ভূত ভাবে ওদের টপকে গেলাম। সামনেই রাস্তায় একটা বাঁক অনেকটা 'ভি' আকৃতির। খুব বেশি হলে ৩ থেকে ৪ ফুট চওড়া হবে। ওদের পক্ষে পার হওয়া অসম্ভব। সুতরাং এগিয়ে গিয়ে বাপিকে পিছন থেকে ডাকলাম। চিন্তা অনেকটা এগিয়ে গেছে ওকে পেলাম না। তারপর যে কাজটা করলাম সেটা এখন ভাবলেও শিউরে উঠি! বাঁদিকে পাহাড়, ডানদিকে প্রায় পাঁচ হাজার ফুট গভীর খাদ, তাকালে মাথা ঘুরে যায়, পায়ের নিচে আলগা নুড়ি। আমরা খাদ পিছনে রেখে শূণ্যে ওয়াল করে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পায়ের তলায় একটু একটু করে নুড়ি সরছে, ওদের সঙ্গে একটু স্পর্শ হলেই আমরা চিরকালের মতো হারিয়ে যাবো। না, তেমন কিছু হলোনা। ওরা সাহস ফিরে পেয়ে একে একে পার হয়ে গেল। তারপর আমাদের জড়িয়ে ধরে আবেগ আপ্লুত হয়ে বললো, 'তোদের এই ভূমিকা কোনদিন ভুলব না। তোরা আমাদের নতুন জীবন দিলি।' পার্থ আমাকে বললো, 'তোর সঙ্গে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি তারপরও এই প্রতিদান!' তোদের এই ভূমিকার কথা আমি জনে জনে বলবো।' আর আমাদের লজ্জায় ফেলে দিয়ে ও এই কর্মটা কলকাতায় না ফেরা পর্যন্ত করেই গেল।
ক্লান্ত, বিদ্ধস্ত অবস্থায় আমরা পূর্ব নির্ধারিত লোহারক্ষেতে(১৭০৮মি.) পৌঁছে গেলাম। অনেকটা রাস্তা। যাবার সময় দুদিন লেগেছিল।
ফেরা এক দিনে।
ট্রেকার্সহাট টি বেশ সুন্দর। রাত্রে খুব ভালো ঘুম হলো। বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠে চা, প্রাতরাশ সেরে দাড়ি কাটার সরঞ্জাম নিয়ে বসলাম। দু একজন আওয়াজ দিলেও তারাই আবার আমার রেজার চেয়ে নিয়ে বসে পড়লো। তারপর কলের গরম জলে ভালো করে শ্যাম্ফু করে স্নান সেরে উঠতেই বিন্দাস। সমস্ত ক্লান্তি উধাও। এবার বিস্রানকে বিদায় দেবার পালা। সবার চোখে জল এসে গেল। বিস্রানও কেঁদে ফেললো। এই কদিনে ও আমাদের একজন হয়ে উঠেছে। ওর প্রাপ্য ও সাধ্যমত বখশিশ দিয়ে বিদায় জানাতে গিয়ে দেখি ও আমার জুতোর দিকে তাকিয়ে আছে। জুতোজোড়া Adidas এর হলেও বেশ পুরোনো এবং আমার ভাইয়ের বাতিল করা। ওর পায়ের জুতোর অবস্থা করুন। সবাই মিলে জুতো কেনার জন্যে কিছু বাড়তি টাকা আর আমার জুতোটা ওকে দিয়ে দিলাম। ওর মুখটা উজ্বল হয়ে উঠলো। যতটা টাকা পেয়ে তার থেকেও পুরোনো জুতো পেয়ে। সত্যি কি সামান্য চাহিদা!বাকি কটা দিন আমিও চপ্পলেই চালিয়ে নিতে পারবো।
ফেরার পথে প্রথমে কৌশানি। ওখানেও বিড়ম্বনা। পরেরদিন রাষ্ট্রপতি আসার কথা তাই সব বন্ধ। হোটেলে জল না পেয়ে পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে ঝর্নার (নালা কিনা জানিনা!) জলে স্মান সারতে হলো। বিকালে ম্যাল থেকে (আমাদের দেখে আসা) চূড়াগুলো আকর্ষণহীন মনে হলো। পরদিন রানীক্ষেত। ওখানে দেখা হয়ে গেল আমাদের এক বন্ধুর দিদি, বিখ্যাত হস্তরেখাবিদ্ পারমিতাদি, জামাইবাবু ও ভাগ্নের সঙ্গে। আমরা একই হোটেলে উঠেছি। অনেকদিন বাদে পরিচিত মানুষ পেয়ে আড্ডা জমে উঠলো। অনেকে হাত দেখাতে চাইলেও আমারা মানে আমি, চিন্তা, বাপি উৎসাহ না দেখানোয় অন্যদের ইচ্ছা পূরণ হলোনা। ওদের কাছেই জানলাম ভূমিকম্পের ভয়াবহতার কথা। উত্তরকাশী নাকি ধ্বংস হয়ে গেছে! যারা পাহাড়ে গেছে তাদের বাড়িতে ভীষণ আতংক।
আমাদের মধ্যে পার্থ ছাড়া কারো বাড়িতে টেলিফোন নেই। পার্থর বাড়িতে ফোন করতেই অপরপ্রান্ত থেকে একটা আনন্দের ঢেউ এ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেল! আবার শোনা গেল 'বেঁচে আছে বেঁচে আছে!' ক'দিন ধরে নাকি আমাদের বাড়ির লোকেরা রাইটার্স বিল্ডিং আর লালবাজার করেছে। কোন খবর পাইনি। সবাই শোকে মূহ্যমান। ধরে নিয়েছে আমরা হয়ত আর ফিরবো না। শুধু শ্রাদ্ধের কাজটাই বাকি! বুঝতে পারলাম ভূমিকম্পের ভয়াবহতা! সত্যিই তবে আমরা বেঁচে আছি!
ইচ্ছে থাকলেও ফেরার উপায় নেই। ফিরতি ট্রেনের টিকিট এখনো তিনদিন বাদে। তাই নৈনিতালে তিনদিন উৎকণ্ঠার মধ্যেও হৈহৈ করে কাটিয়ে পাহাড়কে বিদায় জানিয়ে কাঠগুদাম থেকে বাগ এক্সপ্রেসে চড়ে বসা।
*********সমাপ্ত**********