20_10

প্রচ্ছদ এবং সম্পাদকীয় কলমে

 

দোল দিয়ে যায় কাশের বনে আশ্বিনের হিমেল হাওয়া

শিশির ভেজা শিউলি বেলা বছর ঘুরে ফিরে পাওয়া।

বোধন হতে নিরঞ্জন - ভেদ হীন এক ঐক্যতান,

ঢাকের বোলে খুশির রোল বেজে ওঠে আবহমান।

- ।।মৌলি।।

   সুপ্রিয় পাঠক,

                         তমোঘন এক সময় যখন জীবন জুড়ে অমাবস্যা আনে, মন তখন আঁধার সাঁতরে ফেরে বিপ্রতীপে অমল আলোর সন্ধানে। নিরন্তর তমসার সুগভীর হতে নক্ষত্রপুঞ্জ আলোর দিশা হয়ে লিখে পাঠায় ''তমসো মা জ্যোতির্গময়---''। নীলাভ এ'পৃথিবী ধীরে লৌকিক কষ্ট-সুখের বেড়া ডিঙিয়ে স্বমহিমায় মহিমান্বিত হয়ে ওঠে সেই অনির্বাণ জ্যোতিকে আশ্রয় করে।

                         ''মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়'' মৃত্যু থেকে অমরত্বে পৌঁছানোর সেই আর্তি নিয়েই আমরা জ্বালাতে চেয়েছি এক সংগ্রামী মশাল, যে মশালের আলোই পারে অপ্রতিরোধ্য যত যন্ত্রণার জঞ্জাল জ্বালিয়ে দিতে - ''ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে'' দিতে। মননে যে সৃজন খেলা চলে নিত্য, তার আদিগন্ত জুড়ে শুধুই সম্ভাবনার চিত্রণ, কোথাও হতাশার তৃণাঙ্কুর নেই, পরাভবের গ্লানি নেই, আছে সুপ্তির ভিতর হতে সুপ্তি ভাঙার প্রয়াস। আমাদের সেই প্রয়াসেরই মুদ্রিত প্রকাশ ''শিউলি বেলা'' ।

                      যাব নির্ভয়ে, যদি যেতে হয় না-ফেরার দেশে , 

                       তবু যাব না ফেলে আসা তামসিক দেশে- 

এই অঙ্গীকার থেকেই আজ ''মৃত্তিকা''র চিত্র. আলোকচিত্র ও কলম-শিল্পীরা সকলে মেতে উঠেছেন শারদলক্ষ্মী বন্দনায়, মহামায়া বন্দনায় তথা সর্বোপরি জীবন বন্দনায়।উৎসব, তার ঔজ্জ্বল্য বা আনন্দময় বাতাবরণ তো শুধু এক উপলক্ষ্য মাত্র ; কিন্তু আদতে তার একমাত্র লক্ষ্য সেই মানবসত্তাকে সন্ধান করা ও পুনরুজ্জীবিত করা, যেখানে তার শক্তি, প্রেরণা ও সত্য নিহিত। সৃষ্টি-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তারই প্রতিফলন।

''শিউলিবেলা''ও এমনই এক প্রতিফলনের নাম - মাতৃ আবাহন লগ্নে প্রাত্যহিক গদ্যময় বেঁচে থাকাকে অতিক্রম করার আনন্দ-আয়োজনের নাম।

                     সম্পাদিকা নয়, এক সাধারণ সাহিত্যপ্রেমীর কথনে বলি, সে আয়োজনে অবগাহন করে হৃদি এবং সমাহিত অনুভবে নিজেকে নতুন করে খুঁজে নেয় প্রাণস্পন্দনের আনন্দধারায়। প্রত্যাশা নয়, প্রত্যয় রাখি - সেই প্রাণস্পন্দনের আনন্দধারায় সামিল হলে, এক প্রাপ্তির আবেশ আপনাকেও ছুঁয়ে যাবে। পড়ে দেখুন সুধী - ''মৃত্তিকা'' নিবেদিত ''শিউলিবেলা''- শারদ এক আনন্দমেলা -

                                           রইল আন্তরিক শুভকামনা ও শারদীয়া অভিনন্দন,

,

                                                     সম্পাদিকা, মৌলি বণিক।।

বাংলাদেশের দুর্গোৎসব - দলছুট পাখি

ষোলোয়ানা বাঙালিয়ানার দাদাগিরি বা দিদিগিরি বলতে এককথায় দুর্গা পূজাকেই বুঝি আমরা। আর সেই পুজোর দিনগুলি যদি নির্ভেজাল বাংলায় মানে বাংলাদেশে কাটে, তবে বাঙালি হিসেবে নিজের কাঁধকেই নিজে চাপড়ে দিতেই হয়। গতবছর ২০১৯ সালে পুজোর কয়েকটা দিন বাংলাদেশে কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। 


বাংলাদেশে দুর্গা পূজা কেমন হয় সেটা বলতেই আজ আপনাদের কাছে আসা।কিন্তু পেটে কিছু না দিয়ে কি গল্প শুরু করা যায়? নইলে আপনারাই বলবেন, ডেকে নিয়ে খালি মুখে গল্প শোনাচ্ছেন।


বাংলাদেশ মানে সবুজ প্রকৃতি, দেশীয় চাষাবাদ নির্ভর খাওয়া দাওয়া, আর মানুষে মানুষে আন্তরিক মেলবন্ধন, সে হিন্দু হোক বা মুসলিম। হয়তো কিছু পোশাকের পার্থক্য ছাড়া আপনারা বুঝতেও পারবেন না কে হিন্দু কে মুসলিম। জেলা ভিত্তিক সকল ধর্মের মানুষের মুখের ভাষা এবং বাহ্যিক আচরণ একই।


চলুন একটু বাইরে ঘুরে কিছু খাওয়া যাক। কাছাকাছি ঘোরার জন্য রিক্সাই ভালো। জরিদার রিক্সা মানে সোনালী জরি দিয়ে সুসজ্জিত রিক্সায় চেপে আপনি প্রায় সারা ঢাকা শহর ঘুরে নিতে পারেন। তবে চারজন ব্যক্তি একটা রিক্সায় অনায়াসে বসতে পারেন। অবাক লাগছে তো?

হ্যাঁ দুজন সিটে বসবেন আর দুজন ওনাদের ঘাড়ে, মানে পিঠের দুপাশে পা ছড়িয়ে দিয়ে এক অদ্ভুত পদ্ধতিতে। গন্তব্যে ঠিক সময়ে পৌঁছনোর দায়িত্ব কোনো পরিবহন দপ্তরের নেই। এখানে রাস্তার সিগন্যালগুলো বিরহী রূপাইয়ের মতো একা একাই জ্বলে আর নেভে! কেবলমাত্র ট্রাফিক সার্জেন্টের দুহাত পাখির ডানার মতো নড়াচড়া দেখে গাড়ির চাকা গড়ায়। এই শহরে বেশ কিছুদিন থাকলে আপনার ধৈর্য্য শক্তি বাড়বেই আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, রাস্তায় জ্যামে অপেক্ষা করতে করতে!


যে কোনো পার্কের পাশেই পেয়ে যাবেন * ফুসকা * মানে ফুচকা যাকে আমি সম্পূর্ণ পৃথিবী বলি। কারণ ওর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। অল্প এট্টু আলু আর মগ ভর্তি জল তা পৃথিবীর সমানই তো হলো বলুন।

৫০ টাকা দিয়ে ১০টা *ফুসকা * খেয়ে, পাঁপড়িচাট খেতে খেতে ক্রমশঃ জিভ বার করতে হবে, ঠান্ডা হাওয়া লাগানোর জন্য। বাংলাদেশের মানুষেরা মনে হয় বেশ ঝাল খেতে পছন্দ করেন। যেটা আমার পক্ষে খুবই চাপের ব্যাপার। জিভ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল বার করে ফেলে চলুন একটু এগিয়ে যাই একটা মিউজিয়ামের দিকে। যার জীবন চিত্র না দেখলে বাংলাদেশের অনুভূতি অনুভব করতে পারবেন না।



বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে প্রাতঃস্মরণীয় নাম বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান। বঙ্গবন্ধুর নিজ বাসভবনের লাগোয়া জমিতেই তৈরি হয়েছে স্মৃতি জাদুঘর। ১৯৭১ -এর বাংলাদের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন তথ্য, চিত্রের মাধ্যমে পরিস্ফুটিত করা হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের নমুনা সহ বাংলার বুকে হিন্দু মুসলিমের দুর্দশায় সকল চিত্রই বর্তমান। সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মাননীয়া ইন্দিরা গান্ধী যেভাবে বাংলাকে সর্বত ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তার চিত্রও অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে এই মিউজিয়ামে। মিউজিয়ামটি ঢাকা শহরের ৩২নম্বর ধানমন্ডিতে অবস্থিত।


ঢাকা শহরের বুকে এক বিশাল ঝিল রয়েছে। নাম হাতিঝিল। পূর্বে ওই অঞ্চলটিতে শহরের সকল নোংরা ফেলা হতো। বর্তমান সরকারের উদ্যোগে এর সংস্কার করা হয়। বর্তমানে প্রায় ৫০একর জমির উপর এই ঝিলটি নির্মিত। বোটিং সহ নানান রকমের প্রমোদের ব্যবস্থা রয়েছে এইখানে। সন্ধ্যের পর রঙিন আলোয় এই ঝিলটির শোভা আরও বর্ধিত হয়। চারিদিকে সবুজের ছায়া ঘেরা ঝিলের মোহময় রূপ দেখতে গেলে অবশ্যই হাতিঝিলের পাশে গিয়ে বসতে হবে সন্ধ্যের আলোয়।


আসেপাশে দুতিনটে দুর্গা পূজার প্যান্ডেল চোখে পড়লো। খুব বেশি জমকালো আতিশয্য নেই সেখানে। প্রতিমা দর্শনের উপচানো ভিড়ও নেই। তবে শুনলাম যেখানে যেখানে পুজো হচ্ছে সেই কলোনীর লোকেরা পুজোর দিনগুলোতে একসাথেই প্যান্ডেলে খাওয়াদাওয়া করেন হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে।

এটা জেনে মনটা আনন্দে ভরে গেল। পুজোর আতিশয্য না থাকুক আন্তরিক মেলবন্ধনের উপকরণ ঢালাও।



"কালীঘাটে আছেন কালী, ঢাকেশ্বরী ঢাকায়"

বাংলাদেশের বুকে যিনি পা রেখেছেন আর ঢাকেশ্বরী মায়ের দর্শন করেননি এমন কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর দুর্গাপূজার সময় ঢাকেশ্বরী মায়ের দর্শন এক অনন্য অনুভূতি সৃষ্টি করে।


সুপ্রাচীন কাল থেকেই স্বমহিমায় মহিমান্বিত ঢাকার ঢাকেশ্বরী মাতা। ধাতু নির্মিত দেবী দুর্গা বিরাজমান এইখানে। হাজার হাজার দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই রয়েছে মন্দিরে। যেকোনো রকম অসুবিধার মোকাবিলায় অসংখ্য পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এইখানে। আসল মন্দিরের বাইরে বাঁশের প্যান্ডেলে দশভূজা দুর্গামাতা অসুরদলিনীরূপে বিরাজমানা হয়ে পূজিত হচ্ছেন। দুর্গা পূজার সময় এইখানে একটা মেলার আয়োজনও করা হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা প্রতিদিনই ভিড় জমান এই মন্দিরে।


বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা মসজিদ শহর নামে পরিচিত। দুর্গা পূজা দেখতে এসেছি বলে মসজিদ দর্শন করবো না তাই কখনো হয়? ঢাকার রাস্তার অলিতে গলিতে যে দিকে তাকাবেন মসজিদের অবস্থান চোখে পড়বেই। অসাধারণ সব শিল্পের নমুনা মসজিদগুলোকে এই আলাদা সৌন্দর্য প্রদান করেছে। রঙিন কাঁচ, পাথরে সুসজ্জিত সমস্ত মসজিদগুলো।


হাসান হোসেনের সমাধির রেপ্লিকা দেখতে গেছিলাম। মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এর স্থান মাহাত্ম্য যথেষ্ট। ধর্মযুদ্ধে হাসান হোসেনের প্রাণ বলিদানের সম্মানার্থে যেদিন মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষ নিজেদের শরীরের রক্ত উৎসর্গ করেন সেদিন এই অঞ্চলের পথঘাট রক্তের  ধারায় সিক্ত হয়। আর এই সমাধি ক্ষেত্রের পিছন দিকেই রয়েছে একটা চারদিকে ঘাট বাঁধানো পুকুর। অস্ত্রের আঘাতে মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষেরা নিজেকে ছিন্ন ভিন্ন রক্তাক্ত করে এখানে স্নান করেন। স্থানীয় মৌলবী সাহেবের কথা অনুযায়ী এই পুকুরের জলে শরীরের ক্ষত স্থানের নিরাময় হয়। এইখানে অনেক মানুষই মঙ্গল কামনায় সুতো বেঁধে মানত করে থাকেন। এমনকি হিন্দুরাও। এই সমাধির রেপ্লিকার সৌন্দর্য্য সাধারণ মানুষকে মুগ্ধ করবেই।


অনেকটাই সময় কেটে গেছে এই দুটো স্থান পরিদর্শনে। সন্ধ্যে হয়ে আসছিল আর অন্যদিকে ঢাকার রাস্তার জ্যাম, তাই খুব তাড়াতাড়ি সারতে হলো পরবর্তী দর্শনীয় স্থানগুলো। বিখ্যাত মধুর ক্যান্টিন সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তৈরি শহীদ মিনার। এই শহীদ মিনারের পাশেও ফুচকার দোকান চোখে পড়লো, কিন্তু ঝালের কথা মনে পড়ায় সে ইচ্ছে অতি কষ্টে নিবারণ করলাম। তবে শহীদ মিনারের পাশে, রাস্তার পাশের চা একবার অবশ্যই

খেয়ে দেখবেন, কথা দিলাম ঠকবেন না। ১০ টাকায় এক গ্লাস দুধ চা স্বাদেও যেমন মনও ভরাবে, তৎক্ষণাৎ রাস্তার জ্যামের ক্লান্তিও দূর করবে।



এই নির্মল বাংলাদেশে পুজো দেখার সুযোগ হয়েছিল 

হাই সিকিউরিটি পরিষেবার মধ্যে। বাগমারির এম. পি. ইঞ্জিনিয়ার ইমানুল হক দাদার আতিথেয়তায় ছুটে গেছিলাম সেখানে।  রাজশাহী বিমান বন্দর থেকে প্রতিটি মুহুর্তেই ছিল হাই সিকিউরিটি পরিষেবা।

বাংলাদেশে ভারতীয় দূতাবাসের এসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনার মিঃ সন্দীপ ভাট্টির পরিবারের সাথে দুর্গা মায়ের সামনে অঞ্জলি দেওয়া থেকে শুরু করে ভোগ খাওয়া অসাধারণ এক অমলিন স্মৃতি। গ্রামের সমস্ত মানুষ হিন্দু মুসলিম সকলে একসাথে বসে লুচি, লাবরার তরকারি, ফল, নাড়ু, পায়েস সহযোগে এক অসাধারণ ভোজ। সত্যি কথা বলতে বাঙালির দুর্গোৎসব সব ধর্মকেই এক ছাতার নীচে নিয়ে আসতে পারে তার প্রমাণ আরও একবার পেলাম।


রাজশাহী জেলার যে পুজোটার কথা এখন বলবো তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। 

সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা।

আশ্বিনে শ্রী রামচন্দ্রের অকালবোধন এই দুর্গাপূজা।

এইবার বাংলাদেশের মাটিতে এমন এক পূজায় উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করছি।


এখানে দেখলাম পিতলের মায়ের মূর্তি। এটি ত্রিশ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১০০ কেজি পিতল দিয়ে তৈরি। যদিও এর মাহাত্ম্য অন্য জায়গায়।


১৪৮০ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম দুর্গা পূজার প্রচলন করেন রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের রাজা নারায়ণ কংসবনিক।

পরবর্তী সময়ে ইংরেজ শাসন, সাম্প্রদায়িক অশান্তির কারণে এই পুজো বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান প্রশাসনের উদ্যোগে এই পুজো পুনরায় শুরু হয়েছে। এবছর ৩০লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই নতুন বিগ্রহ তৈরি করিয়ে দিলেন বাগমারার এম. পি. ইঞ্জিনিয়ার ইমানুল হক মহাশয়। আগে যদিও মাটির মূর্তিতেই পুজো হতো। পুজোর প্রথম থেকে যে নিয়ম বা যে ভোগ চালু ছিল আজও একই নিয়ম ও ভোগ ব্যবস্থা চালু।


এরপর ফিরে এলাম আবার ঢাকায়। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির আগেই দর্শন করেছি, আরও একবার দর্শন করলাম ঢাকেশ্বরী মাতাকে। দেশ বিদেশ থেকে বহু দর্শনার্থীদের ভিড় উপচে পড়েছিল এই মন্দিরে।


এছাড়া আরও কয়েকটি আঞ্চলিক প্রতিমা দর্শন করেছি। আগেই বলেছি এখানের পুজোতে বিশেষ কোনো আকর্ষণ নেই আমাদের কলকাতা শহরের মতো। কিন্তু ষোলোআনা আন্তরিকতা রয়েছে এই উৎসবে।

আর কোনো প্রতিমা দর্শন হয়নি এদেশের। তবে পুজোর পরিবেশ ধর্ম নির্বিশেষে অসাধারণ। পুজোর ছুটি বলতে এদেশে অষ্টমী, নবমী, দশমী। তবুও আলোয়, উৎসবে ঝলমল বাংলাদেশ।


রাজশাহীর তাহেরপুরে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম দুর্গা পুজো রাজা নারায়ণ কংসবনিকের প্রতিষ্ঠিত যেখানে উপস্থিত থাকতে পারাটা আমার  জীবনের সেরা প্রাপ্তি।


বছর বছর ঘুরে আসুক এই উৎসবের ক্ষণ।

ধনী দরিদ্র, হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে যেন এভাবেই ভেসে যায় খুশির জোয়ারে।

 বয়ে যাক গঙ্গা পদ্মার জল একই উপসাগরে।


শুধু একটাই কথা-

ধর্ম থাক নিজেকার

উৎসব হোক সবাকার।


বাংলাদেশে পুজোর গল্প তো শোনালাম। কিন্তু বাংলার জন্য একটা কবিতা উপহার রেখে না গেলে এখানকার মানুষ গুলো কি আমায় সহজে ছেড়ে দেবেন? তাই এই ছোট্ট উপহার রইলো সেই সকল মানুষগুলোর জন্য, বাংলার মাটি, আকাশ আর পদ্মার জন্য।



তোমার আকাশ আমায় ডাকে 

আমার জল তোমার গান শোনে

তোমার সবুজ আমায় অবুঝ করে

আমার চোখ তোমার চোখে গল্প বোনে...


পদ্মার বুকে গঙ্গার ভালোবাসা

পাওয়া না পাওয়ার ডুব জলে বিরহ

আকাশের সীমানায় লেখা কাহিনী

নীরবে পাঠ করছি অহরহ...


কাশের মাঠে আমার নিঃশ্বাস

দোলা দেয় তোমার দিগন্তের প্রান্তে

তোমার শহরের ইতিকথা শুনি

রাতের জোনাকির সাথে একান্তে...


তুমি আমি আজ একাকার

ক্ষনিকের অতিথির বেশে

রয়ে যাবো অসমাপ্ত উপন্যাস হয়ে

মনে রেখো একফোঁটা ভালোবেসে।।


©দলছুট পাখি





ভালোলাগা ভালোবাসা যেখানে মিশে একাকার-

ফিরবো হয়তো কোনো একদিন সেখানে আবার।


"""""""""""""""""""""""""""""""""""""


সব অপরিচিত মুখগুলো যখন কিছু কথায়, কিছু ব্যবহারে, কিছু আচরণে মনের উপর লিখে দেয় কিছু না ভুলতে পারা কাহিনী তখন হাজার চেষ্টাতেও তাদের মুছে ফেলা সম্ভব হয় না। যদিও সে চেষ্টা করা আমার কাছে ধৃষ্টতা। যদি কোনোদিন স্মৃতি বেইমানি না করে তবে রয়ে যাবে চিরকাল সেই গল্পের চরিত্রগুলো।


বাগমারার এম. পি. এনামুল হক দাদার বন্ধুত্বের ডাকেই সারা দিয়ে আমার বাংলাদেশ ভ্রমণ। ওনার এবং ওনার পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ। তবে ওনার মেয়ে তান্নির রান্নার প্রশংসা না করে কোনো নিন্দুক থাকতে পারবে না। ওনার অফিসের প্রতিজন স্টাফ এবং ড্রাইভার ভাইদের ব্যবহার অমায়িক।


আলতাফ ভাই আর তাঁর পরিবারের কথা আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর দুই ছেলে রঙ্গন ও আরিফ সুপ্রতিষ্ঠিত নিজেদের কর্ম জগতে। তাদের কাছে আমার মতো একজন অপরিচিত (আন্টি) মানুষ যেন প্রথম দেখাতেই এক অত্যন্ত কাছের মানুষ।

আলতাফ ভাইয়ের ছোট বৌমা কখন যে আমাদের এত কাছের মানুষ হয়ে উঠেছে বুঝতেই পারিনি। ওর চোখের জল বুঝিয়ে দিয়েছে ওর মনের পরিচয়।


বাগমারা, তাহেরপুর, রাজশাহীর মানুষজনের সান্নিধ্য আমার এক পরম প্রাপ্তি।

" মাসি আবার আইস্য"

" বৌদি আপনেরে আমগো খুব ভালো লাগসে"

"আপনেগো খুব মিস করুম"

" যোগাযোগ রাইখ্যেন"

-এই কথাগুলো ভুলব না কোনোদিন। 


মমতাজ বেবি দি কত সহজে যখন বলেন নিজের পরিবারের কথা, সত্যি মনে হয় আমি বুঝি ওনার পরিবারেরই একজন সদস্য।


কেউ একজন অনেক ভিড়ের মধ্যে মাসকলাই-এর রুটি আর কাঁচা লঙ্কার চাটনি এনে দিয়েছিল হাতে। একটুকরো মুখে দিয়েই চোখের জলে নাকের জলে একাকার হয়েছি ঝালে। কিন্তু ওখানের এই বিখ্যাত খাবার আমার হাতে দিয়ে উনি অনেক খুশি হয়েছিলেন, তাই আমার পক্ষে কোনদিনই ভোলা সম্ভব নয় সেই মুহূর্তটা। 


সজনে ডাঁটা, কুমড়ো দিয়ে কৈ মাছ; টম্যাটো দিয়ে ছোট ট্যাংড়ার পাতলা ঝোলের অপূর্ব স্বাদ আপনাদের বোঝানোর সাধ্য নেই আমার।


আমার ছেলে আর ব্যাগের দায়িত্ব সারাক্ষন যে নিয়েছিল সে হলো উজ্জ্বল। ওর আন্তরিকতায় মনে হচ্ছিল ও আমার নিজেরই ভাই।


"বৌদি আমার একদম উঠতে ইচ্ছে করছে না আপনার গল্প রেখে। মনে হচ্ছে সারাক্ষন বসে আপনার গল্প শুনি।" এই বক্তব্যের মালিক হল শাকিল। এখনো পর্যন্ত প্রতিদিন আমার খোঁজ খবর নিয়ে চলেছে সে। ওর খাওয়ানো মিষ্টি পান এখনো মুখে লেগে আছে। পরের বার আবার সেই পানটাই চাই কিন্তু শাকিল।


রাজশাহী আর ঢাকায় শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়দের খুঁজে পাওয়া আমার কাছে অনেক বড় একটা পাওনা। বোন, দাদাবাবু, ভাগ্না, ভাগ্নি তোমাদের খুব মিস করছি।


কালাম ভাই আপনার দোকানের শাড়ি নেওয়া হলো না এবার। পরের বার নিশ্চয়ই নেবো। তবে আপনার সাথে কাটানো বিকেলটা মনে থাকবে সারাজীবন।


সদা হাস্যময় সাগর দা আপনি বৌদির খুব ভালো করে যত্ন নিন। আপনার সেলফি ম্যানিয়া আমার খুব ভালো লেগেছে। 


আরও অনেকের কথাই লেখার ছিল, কিন্তু তাদের নাম জানি না।


নাম না জানলেও মুখগুলো মনে থাকবে সারাজীবন।


সত্যি কথা বলতে আমি এতটা ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য কিনা জানিনা, তবে যেটা পেয়েছি তা আমার কাছে অনেক বড় সম্পদ। আপনাদের ভুলতে পারবো না কোনোদিন। খুব ভালো থাকুন সবসময় আপনারা।


হয়তো আবার কখনো দেখা হবে এপারে নয়তো ওপারে...💐💐

ভাল থাকার পরে - মানস সরকার

পাতাগুড়ি থেকে গোসাবা। বাই কার আধঘন্টার বেশি সময় লাগা উচিত নয়।

স্টেট ট্যুর প্রোগাম অফিসার সেটাই বলেছে সোহমকে। সিকিউরিটির দু’টো

গাড়ির মধ্যিখানে লাল আলো লাগানো ছাইরঙা জেনে চেপে বসে

চুরানব্বই’এর ব্যাচের একমাত্র বাঙালি আই.এ.এস সোহম সেনগুপ্ত।

পেছনের সিটটা জুড়েই শুধু ও। ড্রাইভারের পাশে সাফারি পরা ওর

পার্সোনাল সিকিউরিটি, যার সতর্ক চোখ এখন রাস্তার দু’পাশে।


চব্বিশ ঘন্টা হয়ে গেল সোহমের

ওয়েষ্ট বেঙ্গলে। শেষ পাঁচ বছরে পাঁচ ঘন্টা একটানা ছিল কিনা সন্দেহ

আছে। সকালের ফ্লাইটে এসে বিকেলের ফ্লাইটের দিল্লি ফেরত গেছে।

পরশু সন্ধেবেলাতেই রিলিফ মিনিস্ট্রি থেকে ফোন ভেসে এসেছিল। -

গেট রেডি, বাড্ডি। য়্যু হ্যাঙ অ্যান অ্যাসাইনমেন্ট টু অ্যাকোমপ্লিশ।

ধক্ করে উঠেছিল বুকটা। আনাচে-কানাচে থেকে গুঞ্জন ভাসছিল।

সোহমকেই হয়তো টিমটা লিড করতে হবে। সাউথ বেঙ্গলে একটা ভয়াবহ

ঝড় আছড়ে পড়েছে। আয়লা। সেন্ট্রাল, রিলিফটা ফরওয়ার্ড করার আগে

ক্ষয়ক্ষতিটা কনফার্ম করতে চায়।


- স্যার, সোহমের দৃঢ় স্বর বোধহয় ফোনের ও প্রান্তেও

পৌঁছে গিয়েছিল। রাঙাকাকার বাড়িতে ফোন লাগিয়েছিল রাতেই।

ফোনটা তুলেছিল কাকিমা। গলায় বাড়তি উচ্ছ্বাস ফুটে উঠেছিল সোহমের

ফোন পেয়েই। 

- শুভ, কেমন আছিস? সুমনা ঠিক আছে?


(২)


- ভাল, সোহম সংক্ষিপ্তভাবেই সারতে চেয়েছিল।

- আসছিস কবে? কাকিমা শেষ কয়েক বছর একটু বেশি আন্তরিকতা দেখাতে চায়।

- কালই।

- ওঃ মা! সে কীরে! সুমনা আসছে তো?

- না গো। অফিসিয়াল ট্যুর। মিসেস পারমিটেড নয়। ঝড়টা যেখানে হয়েছে, যেতে হবে।

- তাই?

সোহম বুঝতে পারল না, নিজের ছেলের পজিশনটার সাথে সোহমের বর্তমানটা মিলিয়ে নিলেন কি না কাকিমা। বরাবর তুলনা করে এসেছেন।

সোহম আর সুদীপ্ত’র স্কুলে পড়া থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত। সুদীপ্ত এখন স্কুল মাস্টার। সোহম সর্বভারতীয় শাসনতান্ত্রিক বিভাগে।

সরকারী বাংলো, গাড়ি, সিকিউরিটি, চ্যানেলে ইনটারভিউ – সুদীপ্ত'কে

জীবনের দৌড়ে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে সোহম। এখন যদি কেউ ওকে

জিজ্ঞাসা করে, - কেমন আছো? ‘ভালোর’ আগে একটা খুব না বসিয়ে পারে

না। 

- তোমাদের ওখান

থেকে একটু ঘুরে যাব ভাবছি। কাকিমা সুযোগ নিতে দেরি করেননি। সোহম আই.এ.এস. হবার আগে কোনওদিন এভাবে বলেছেন কি! 

নাকি বাজারওলার ছেলে বলে ---। 

- খাওয়াটা এখানেই সারবি কিন্তু।

 - সে হবে’খন। ছাড়লাম। নিজের মধ্যে তাড়া আসছিল ফোন ছাড়ার। কখন জরুরী ফোন আসে, বলা যায় না। কাল রাতে রাঙাকাকার বাড়ির রাস্তায় ওর গাড়ি ঢুকতেই আশে-পাশের বাড়ির

জানালা বা ব্যালকনিতে উৎসাহী চোখ-মুখের সারি দেখতে পেয়েছিল। তাও

অনেকদিন পর এ পাড়ায় আসা। ইছাপুর, নবাবগঞ্জের এই এলাকারই ছেলে সোহম। জানেও অনেকে। বেশ কিছু বছর প্রবাসী থাকার পরও। তাছাড়া স্কুটার’এর আওয়াজ আর সঙ্গের নিরাপত্তারক্ষীরা ওকে সাধারণ মানুষের কাছে ভগবানের সমান করে তুলেছে।


নিজের বাড়ির সামনেই গাড়ি দাঁড় করায় সোহম। গেটের

সামনে কাকিমা আর সুদীপ্ত দাঁড়িয়েছিল। হাসি মুখে এগিয়ে এসেছিল।

উল্টোদিকের বাড়িটাই রাঙাকাকার।


নিজের বাড়ির দিকে তাকায় সোহম। বছর বারো

আগেও টালির ছিল। দিল্লি থেকে টাকা পাঠিয়েছিল। রাঙাকাকাই দাঁড়িয়ে

থেকে ঢালাই করিয়ে দিয়েছিল। ফোনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কাকা প্রায়

বিগলিত হয়ে গিয়েছিল। বাড়িটাকে ঘিরে সোহমের হাজার একটা স্মৃতি

আছে। বাবার বাজার বিক্রি। ওর স্কুলে পড়া। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার

মাঝেই বাবাকে হারানো। মা’এর রান্নার কাজ। দাঁতে দাঁতে চিপে পড়াশোনা

আর ইকনমিক্‌সে ফার্স্টক্লাস। সবাই যখন বলছে টিচারিতে ঢুকতে, তখন সোহমকে মা বাড়ি বন্ধক দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন দিল্লিতে। ইউ.পি.এস.সি পরীক্ষার কোচিং নিতে। সাবাইকে অবাক করে দিয়ে একচান্সে সোহমের আই.এ.এসে চান্স – সব ঘটনাগুলো নিয়ে মালা গাঁথলে রূপকথা মনে হয়।

সোহম যখন কর্ণাটকের ক্যাডার হয়ে ট্রেনিং পিরিয়ডে, তখন মা'কেও বাবা ডেকে নিল। অভাব বা ক্ষিদের মতো শব্দগুলোর শরীরী রূপকে দেখেছে সোহম। তখন কেউ জিজ্ঞাসা করলে মিথ্যে বলতে হতো যে, ও ভাল আছে।

আজ যে সত্যি ভাল আছে গোটা পৃথিবী-কেই ডেকে দেখাতে ইচ্ছে করে।

রাঙাকাকা নেই। মেয়ের কাছে। টুপুর, সোহমের থেকে অনেক ছোট। কিন্তু বিয়ে হয়েছে তাড়াতাড়ি। খেতে বসে কাকার না থাকার আফশোসটা করেও ফেলল সোহম। কাকিমার উত্তরেই

সোহম বুঝতে পারল, ওকে নিয়ে আলোচনাটা একপ্রস্থ

সারা হয়ে গেছে।

- সকালেই ফোন করেছিল। বললাম, তুই আসছিস। বলল, আমি তো আর শুভ’র মতো প্লেন ধরব আর কলকাতায় পৌঁছতে পারব না। শুভ'কে

বোলো, আমি ওকে ফোন করব।

অল্প হাসে সোহম। বাড়িটা ফাঁকা পড়ে থাকলেও সোহম

এখনও বিক্রি করার কথা ভাবেনি। পুরো বাড়িটাই দেখাশোনা করে রাঙাকাকা। বাড়িটার চাবি ওবধি থাকে কাকার কাছেই। কাকার উপর একটা অন্যরকম কৃতজ্ঞতা বোধ করে সোহম। মৃদু গলায় উত্তর দিয়েছিল, আমার মোবাইলেই করতে বোলো। কাকিমা নিজে হাতে রান্না

করেছিল। ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন কষা খেয়ে বেরোতে বেরোতে একটু রাতই হয়ে গিয়েছিল। সরকারী কাজে এসেছে। রাত কাটানোর কথা সার্কিট হাউসে। আজকে অবশ্য খুব ভোরেই বেরিয়ে এসেছে সার্কিট হাউস থেকে।

গাড়ির কাঁচ তোলা।

ভেতরে এসি চলছে। বাইরের তাপের কোনও ছোঁওয়াই পাচ্ছে না সোহম।

গাড়ির ভেতর থেকেই এসেছে সোহম। পাঁচ জনকে ভাগ করে পাঠিয়েছে তিন

জায়গায়। নিজে এসেছে গোসাবার পরিস্থিতি দেখতে। এতক্ষণ এক দেড় কিলোমিটারের মধ্যে দু’তিনটে করে বাড়ির ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ছিল। মহিষপুরের মোড় বেঁকে গাড়িটা কাঁচা রাস্তায় ঢুকতেই সোজা হয়ে

বসল সোহম। সুনামীর সময়ে তামিলনাড়ু যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আসার আগে নিজের ল্যাপটপে সিডার’এর ছবি দেখছিল। এখন মনে হচ্ছে, ঝড় শুধু পশ্চিমের দেশে বয় না, ভারতবর্ষেও বয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বেশি।

এখানে প্রতিরোধ কম, ক্ষয়ক্ষতি বাড়তি।

গাড়ি এগিয়ে চলেছে। গাড়ির কাঁচ নামিয়ে ফেলেছে

সোহম। মাঝে মধ্যে গাড়ি থামিয়ে দু’একটা ফটোস্ন্যাপ নিতে হচ্ছে। ফাইনাল রিপোর্টে ছবি থাকলে মিনিষ্ট্রি বেশি খুশি হয়। কাজের ব্যাপারে কেরিয়ারের শুরু থেকে সোহম খুব সিরিয়াস।

চারিদিকে শুধু জল আর জল। ‘ওয়াটার ওয়াটার এভরি হোয়ার, বাট

নট্‌ এ্যা ড্রপ টু ডিংক।’ ভি.আই.পি’র গাড়ি দেখে মানুষজন এগিয়ে আসছে।

জলের স্রোতের শব্দ শুনতে পাচ্ছে কোথাও। মানুষের গলার আওয়াজও।

গাড়ি থামতে দরজা খোলে সোহম। সামনে বসে থাকা সিকিউরিটি ওর

দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

 - স্যার, ভীষণ মাড্‌। জুতো-মোজা ভিজে যাবে।

 - থ্যাংকস, বাট আই উইল গেট ডাউন। 

নেমেও আসে সোহম। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর গায়ে ঠিকমতো জামাকাপড় নেই। মুখের হাসিটা যেন কোথায় মিলিয়ে গেছে।

একসঙ্গে অনেক কিছু বলতে চাইল। এগিয়ে আসতে চাইল। সিকিরিউটি বাধা দিলে সোহম সিকিরিউটিকেই বাধা দেয়।

 - আসতে দিন ওদের।

কিন্তু এক এক করে........ খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো, বুকের হাড় আর হাতের শির বের করা লোকটার লুঙ্গিটাও ছেঁড়া।

নিজের বাবার কথা মনে পড়ল সোহমের। লোকটা সামনে এসে দাঁড়ায়। সোহম

প্রশ্ন করে,

 - কী অসুবিধা আপনার? খাবার-দাবার পাচ্ছেন ঠিক মতো?

- হ্যাঁ, কিন্তু হ্চ্ছে গে, অন্য অসুবিদে রোয়ে।

- বলুন, সোহম শুনতে চাইছে। - ছেলিটা ইস্কুলি যেতি পেততিচ্ছে না। পোড়াশোনার বড় শখ। বই ভেসি গে,---


সোহম চুপ করে আছে। লোকটা কি আরও কিছু বলবে! কোথা থেকে

কোকিল ডেকে উঠল। নাঃ, কোকিল নয়, রিংটোন। আশেপাশের কারোর

থেকে বেজে উঠেছে। সোহম চোখ তুলে তাকাতেই তড়িঘড়ি বন্ধ হয়।

- আপনার বাড়ি কোথায়, সোহম হালকা করে প্রশ্ন করেছে।

- ঐ টে.......

যে দিকটা নির্দেশ করে সেখানে দৃষ্টিটা নিক্ষেপ করার চেষ্টা করে সোহম। জলে ডোবা জায়গাটা থেকে একটা আমগাছ নজরে আসে। লাল টালির আবছা দু’একটা বাড়ির মাথাও যেন। একইরকম বাড়ি আগে যেন কোথায় দেখেছে। কোথায় যেন.....


সবাইকে চমকে দিয়ে এবার সোহমের নোকিয়ার ই-সেভেনটিটু বেজে উঠেছে। টুপুরের নাম্বার। রিসিভ করতেই ও প্রান্তে রাঙাকাকার গলা ভেসে আসে.....

- শুভ?

রাঙাকাকার স্বরটা কি একটু তেলা লাগছে?

- হ্যাঁ গো, বলো।

- অনেকদিন কথা হয় না। কালকে দেখা হল না। আছিস কেমন?

- আমি?

কী বলবে বুঝতে পারে না প্রথমে সোহম। তারপর গলা

নামিয়ে খুব আস্তে আস্তে বলে ওঠে, 

- ভাল না।


দূরের টালির বাড়িগুলো তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

শারদাঞ্জলি - মনিভা সাধু

সুসজ্জিত ফ্ল্যাটের সামনে নেমপ্লেটে লেখা আছে "লালন মুখার্জী,অদিতি মুখার্জী"।পুলিশ অফিসার দরজায় নক করতেই দরজা খুলে গেলো।বয়কাট চুল,বড়বড় টানা দুচোখ,ডিমালো গড়নের মুখ,লম্বা,ছিপছিপে চেহারার অদিতি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

" আরে,রঞ্জিত না?তুই এখানে,কি মনে করে?"অদিতি অবাক।

"তুই?অদিতি,তুইই বা এখানে কেন?" রঞ্জিতেরও একই অবস্থা।

"আরে,এটা তো আমারই ফ্ল্যাট।এখানে আমি আমার হাজব্যান্ডের সাথে থাকি।"

"ও মাই গড!তার মানে লালন মুখার্জী তোর বর? এই মানুষের জন্যই তুই বাড়ি থেকে পালিয়েছিলি?"রঞ্জিত সামান্য হাসে।

অদিতি দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বন্ধুকে আহবান জানায়," হ্যা।আয়, আয়,তুই ঘরে এসে বোস।"অদিতি রঞ্জিতকে ঘরে ঢুকিয়ে  দরজা বন্ধ করে,সামান্য উঁচুস্বরে লালনকে ডাকে,"এই শুনছো,একটু এদিকে এসো।"

রঞ্জিত সোফায় বসতেই লালন ভেতরের ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে, অদিতি তার কলেজের সহপাঠী রঞ্জিতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। রঞ্জিত একটু অস্বস্তি বোধ করে কেননা ও একটা তদন্তে এখানে এসেছে। আসার আগে পর্যন্ত জানতো না এটা তার এককালীন বান্ধবীর ফ্ল্যাট।

"আসলে আমি একটা অফিসিয়াল ব্যাপারে ইন্সপেকশন করতে এখানে এসেছি।"রঞ্জিত সময় নষ্ট না ক'রে বলেই ফেলে।

লালন তার দীর্ঘ,গৌরবর্ণ সুঠাম পুরুষালি চেহারা কাঁপিয়ে হোহো করে হেসে ওঠে,"আই থিংক আই নো এবাউট ইয়োর ইন্সপেকশন। ইফ আই এম নট রং ইটস অল এবাউট মাই সো কল্ড রিলিজিয়ন।এম আই রাইট? "

"নো,ইউ আর এবসলুউটলি কারেক্ট। আসলে ওপরমহল থেকে এব্যাপারে তদন্তের ভার পড়েছে এই অধমের ওপর।"রঞ্জিত সামান্য হলেও অস্বচ্ছন্দ  বোধ করে,হাজার হোক কলেজে পড়ার প্রথম দুবছর অদিতি তার সহপাঠী ছিল।

"কেন,অনেকেই তো চাকরিবাকরি করেও ব্যবসা করে,অনেকে শিক্ষকতা করেও টিউশনি করে।এতে তো কোন সমস্যা নেই।আসল ব্যাপার হচ্ছে "ধর্ম"ঘটিত,তাই তো?ওতো কিন্তু কিন্তু করছেন কেন? বলে ফেলুন যা বলতে এসেছেন।এই অদিতি,তোমার ফ্রেন্ডকে এসে দেখো।এই প্রফেশনে এতো সফট মাইন্ডের লোক,ভাবাই যায়না।"লালন রঞ্জিতের মুখোমুখি বসে।

অদিতি কিচেনে কিছু করছিল,লালনের ডাকে ট্রে হাতে ড্রইংরুমে আসে। দুটো প্লেটে কয়েকটা মিষ্টি আর চানাচুর,  সাজিয়ে রঞ্জিতের হাতে একটা প্লেট আর একটা লালনের হাতে তুলে দিয়ে নিজেও সোফায় বসে,"কি ব্যাপার রঞ্জিত,এনিথিং আর্জেন্ট? "

"আমার মনে হয় পাড়ায় দুর্গাপূজোয় আমার পৌরোহিত্য  নিয়ে কিছু বিরুদ্ধমতের লোকজন থানায় গিয়ে অভিযোগ  করেছে।কি,ঠিক তো?

"একদমই ঠিক।আসলে এতোদিন অনেকেই আপনার সঠিক পরিচয় জানতো না, এখন জানার পরে তারা আপত্তি তুলেছে অথচ আপনি নিজের অবস্থান থেকে সরতে চাইছেন না। কারণ জানতে পারি?" রঞ্জিত লালনের কাছে সরাসরি প্রশ্ন রাখে। 

"পূজো কমিটির লোকেরা এসেছিল তাদের ভুল সংশোধনের জন্য।এই নিয়ে আমার সাথে কথা কাটাকাটিও হয়েছে তবে এরজন্যে যে তারা থানাপুলিশ করবে এটা আমি ভাবিনি।আসলে জন্মসূত্রে আমার দাদু মানে মায়ের বাবা মসজিদের ইমাম ছিলেন,এদিকে আমার বাবা খাঁটি ব্রাহ্মণের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই মন্দির-মসজিদ দু-জায়গাতেই গিয়েছি বাবা-মায়ের হাত ধরে।আর আমার ঠাকুর্দা অধ্যাপক হলেও খুবই গোঁড়া মানুষ ছিলেন। বাড়ির পূজো অর্চনায় নিজেই পৌরোহিত্য করতেন।বুঝতেই পারছেন বাবা-মায়ের বিয়ে প্রেমঘটিত।প্রথমে ঠাকুর্দা মাকে মেনে না নিলেও পরে মায়ের আচার ব্যবহারে বেশ কিছুটা নরম হন তবে পূজো আচ্চায় মায়ের ভূমিকা ছিল শুধুই দর্শকের।বড় হয়ে এসব বিধিনিষেধের ব্যাপার বোঝবার আগেই ঠাকুর্দা মারা যান।মারা যাওয়ার আগে ঠাম্মি আর বাবাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করান যেন বাড়ির পূজোয় মা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ না করে।মা, বাবাকে জিজ্ঞেস,করে জানতেও চেয়েছিলেন,সহধর্মিণীর প্রকৃত অর্থ। বাবা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে গম্ভীর কন্ঠে বলেছিলেন,"পিতা স্বর্গ,পিতা ধর্ম,পিতাহি পরমং তপ।যে মানুষটা আজীবন তার নিজস্ব বিশ্বাসে আস্থা রেখে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে যাতে সে-ই বিশ্বাসের অন্যথা না হয় তারই প্রতিশ্রুতি চেয়েছে তার একমাত্র পুত্রের কাছে,সেটা না রাখলেও যে মানসিক যন্ত্রণা পাবো।তুমি যদি প্রকৃত সহধর্মিণী হও,এটুকু না বোঝার কিছু নেই।"ঠাম্মি গত হলেও বাবা এখনো সেই পরম্পরা বজায় রেখে চলেছেন।মা এই নিয়ে আর কিছু অভিযোগ করেনি।কিন্তু এই নিয়েই আমার সাথে বাবার মতানৈক্য ঘটে,আমি পৃথক ফ্ল্যাটে থাকা শুরু করি তবে বাড়িতে যাতায়াত আছে। আসলে ছোটবেলা থেকেই ঠাকুর্দার সুললিত কন্ঠে মন্ত্রোচ্চারণের আওয়াজে ঘুম ভাঙতো।আবার ছুটিছাটায় দাদুর কাছে গেলে কোরানের সুরা শুনে মুগ্ধ হতাম। এভাবেই কখন যে উর্দু,সংস্কৃত দুই ভাষার প্রতিই এক অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি হয়ে গিয়েছে, তারপর কলেজে কেমিস্ট্রি  নিয়েই অনার্স পাশ করলাম, কলেজ থেকে বেড়িয়ে মাস্টার্স করতে অদিতির কলেজে ঢুকলাম।ক্রমে অদিতির সাথে আলাপ পরিচয়।" একটানা বলে লালন থামে।

"বুঝলাম।কিন্তু অনেকেই এখন আপনার প্রকৃত পরিচয় পেয়ে মন্ডপের পূজোতে আপনার পৌরোহিত্যে আপত্তি করছে।এটা আপনি ঠিক করছেন না। পৌরোহিত্য ছাড়া পূজোর অন্য যে কোনো কাজেই আপনি পার্টিসিপেট করতে পারেন।"

লালন উত্তেজিত হয়ে বলে,"বেঠিক কেন? অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো হিন্দুশাস্ত্রমতে পূজো হয়, আবার তার সাথে পঁচিশে ডিসেম্বর চার্চের যীশুকেও পূজো করা হয়,ওদিকে মাজারে যেতেও বাধা নেই।আর আমি তো জন্মসূত্রেই হিন্দুও আবার মুসলমানও।অসুবিধে কোথায়? ইফ ইউ ওয়ান্ট টু চেঞ্জ দিস সোসাইটি,ফার্স্ট চেঞ্জ ইয়োরসেল্ফ।"

রঞ্জিত জলের গ্লাস নামিয়ে রাখে, "ঠিকই বলেছেন,ফার্স্ট নিজেকে,নিজের পরিবারকে বদলাতে হয়।সেটা কি আপনি পেরেছেন?এক্ষুনি আপনার মুখেই নিজের বাবার কথা শুনে তা তো মনে হোলোনা।তাছাড়া,একটা ব্যাপারে আপনি একটু গুলিয়ে ফেলছেন। মন্দিরে পুরোহিত,মসজিদে ইমাম, গীর্জায় ফাদার ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের  পৌরোহিত্যর অধিকার আজও সেভাবে চালু হয়নি,আর দুর্গাপূজোটাও হিন্দুদের কাছে আবেগের ব্যাপার।যখন সমাজ আপনা থেকেই বদলাবে তখনই নাহয় এসব ভাবা যাবে।"

"জানিস রঞ্জিত, ওর ভরাট গলার আবৃত্তি শুনেই আমি ওর প্রেমে পড়ি। কর্পোরেট অফিসে কাজ করলেও আবৃত্তি ওর প্যাশন।তুই তো জানিসই বাবা মারা যাওয়ায় আমি আর মা মামাবাড়িতেই থাকতাম।মামা আমার সাথে লালনের প্রেমের ব্যাপারটা কোনদিনই মন থেকে মেনে নেয়নি।বাধ্য হয়েই রেজিস্ট্রিম্যারেজ করেই বিয়ে হয়।অবশ্য ওদের বাড়িতে কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষকে নিমন্ত্রণ করে একটা পার্টি দেওয়া হয়।আমার মা গতবছরেই মারা গিয়েছে,লালনের মা বাবা সল্টলেকে পৈতৃক  বাড়িতেই থাকে।আমাদের একমাত্র ছেলে,যীশু নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ক্লাশ সিক্সে পড়ে।"অদিতি রঞ্জিতকে এপর্যন্ত বলে উঠে দাঁড়ায়,"একটু বোস,চা আনছি।'

অদিতি চলে যেতেই লালন গেয়ে ওঠে,"বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ,বামনী চিনি কেমনে!"।রঞ্জিতের অস্বস্তি হয়,সে নিজেও মন থেকে লালনের এই পূজো করাটা মেনে নিতে পারছে না।

"মুখে প্রগতিশীল হতে সবাই পারে, কিন্তু মনে?এ দেশে এখনো ধর্ম নিয়ে রাজনীতি চলে আর আপনাদের মতো আইনরক্ষক নেতাদের কথায় চলেন। কেন জনসাধারণকে বোঝাতে পারেননা ' সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই।'এবছরেই প্রথম দুর্গাপূজোয় পৌরোহিত্য করার কথা হয়েছিল। সেটাও অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে চলেছে। আসলে আপনিও চাননা আমি পূজোর মন্ত্রোচ্চারণ করি।অথচ বহু অনুষ্ঠানে আমার পুরুষালী কন্ঠের স্তোত্রপাঠে উপস্থিত শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শোনে, আমারও কেমন যেন নেশায় ধরে, সেসময় নিজেকে চিনতে পারিনা। ঠাকুর্দা যেন আমার ওপর ভর করে, আমি একের পর এক সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চস্বরে বলে যাই।সেই আমি কি মিথ্যে আমি?"লালন স্পষ্টতই হতাশ।

"অনুষ্ঠানে তো কেউ আপত্তি করছে না।কিন্তু--।"রঞ্জিত কথা শেষ না করেই থামে।

লালন বিদ্রুপের সুরে বলে,"পূজোও ধর্মীয় অনুষ্ঠান-ই।"

"ওই যে বললেন,'ধর্মীয়'!এই নিয়ে আর ঝামেলায় যাবেন না।"

অদিতি চায়ের টিপট আর কাপ নিয়ে ফিরে আসে,চিনির পরিমাপ জেনে নিয়ে দুজনকে দিয়ে নিজেও এককাপ নিয়ে বসে,"রঞ্জিত,তুই কি চাস?"

"কমিটির মেম্বাররা যখন চাইছে না তখন এ ব্যাপারে আর না এগোনোই ভালো।প্রশাসন কোন রিস্ক নেবেনা, এরপর সাংঘাতিক কিছু হয়ে গেলে থানাপুলিশ   করে কিছু লাভ হবেনা। এখন পাব্লিক একটুতেই আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে,সাবধানে থাকাই উচিত।হাতে এখনো একমাস সময় আছে,ভেবে দেখুন।আজ উঠি।"রঞ্জিত লালনকে নমস্কার করে অদিতির দিকে সামান্য হেসে ফ্ল্যাট ছাড়ে।

অদিতি দরজা বন্ধ ক'রে লালনের পাশে এসে বসে,"এবার?"

লালন অদিতির কাঁধে হাত রাখে "ঘরে-বাইরে বদল তো হচ্ছেই,বাবার থেকে আমি, এরপর হয়তো আমার ছেলেও--!এখন তুমি যা বলবে তাই হবে।অযথা ভয়ে ভয়ে বাঁচার জন্য তো সংসার পাতিনি।"

অদিতি লালনের দিকে ফেরে,পূর্ণদৃষ্টিতে চায়,"জীবনভোর একঘরে থাকতে ক্লান্ত লাগে,তারচেয়ে অপেক্ষায় থাকি। তোমাকে নিয়েই আমার স্বপ্ন,কোন মূল্যেই আমি তোমাকে হারাতে চাইনা। বরং তোমাকে যে অডিও কোম্পানি যোগাযোগ করতে বলেছিল,তাদের সাথে যোগাযোগ করো।"

"যথা আজ্ঞা,মহারানী,আপনার কথাই শিরোধার্য।"লালন মুচকি হাসলো।

সেবারেই বহু পূজোমন্ডপে বিখ্যাত রেকর্ডিং কোম্পানি থেকে প্রকাশিত লালন মুখার্জীর সুগম্ভীর কন্ঠে স্তোত্রপাঠ গমগম করে বাজতে শোনা গেলো।রাতের আলোয় যীশুর হাত ধরে দুর্গাঠাকুর দেখতে বেড়িয়ে লালন অদিতির দিকে তাকিয়ে বলে,"ভাগ্যিস বুদ্ধিটা দিয়েছিলে!!এভাবেও অস্তিত্ব জানিয়ে শারদাঞ্জলি দেওয়া যায়।"

ঢাকি - মাম্পি সরকার

এমনি সময় বুধুয়া ক্ষেতে কাজ করে কিংবা মাছের ভেরীতে কাজ করে। কিন্তু ওর ঢাক বাজানোটা নেশা। আর বাজানোর হাতখানাও খাসা। সেই ছোটবেলায় যখন ক্লাস ফোরে পড়ত, তখন থেকে ওর এই নেশা চেপে বসে। পাড়ার একমাত্র পূজায় যে ঢাকি আসতো, তার নাম ছিল স্বপন বুড়ো। কি মিষ্টি হাত ছিল তার। তাকে মুগ্ধ হয়ে দেখতো বুধুয়া। বাজনার বোল গুলি কিভাবে কাঠি দিয়ে ঠিকরে বেরোচ্ছে তা দেখে অবাক হত সে । একদিন সাহস করে চেয়ে ফেললো কাঠিটা। বুড়ো হেসে দিলো ওকে। আনাড়ি হাতে ঠিক বোল বাজলোনা। বুড়ো তখন যত্ন করে শেখাতে লাগলো। চারদিন ধরে অসীম নিষ্ঠায় শিখলো বুধুয়া। পূজার শেষে বাসনে কাঠি দিয়ে বোল তুলতে লাগলো। রোজকার অভ্যাস ওকে ওস্তাদ করে তুললো। প্রতিবছর পূজায় ও স্বপন বুড়োর সাথে ঢাকে কাঠি দিত। একসময় পড়া ছেড়ে চায়ের দোকানে ঢুকলো ও। টাকা জমিয়ে একটা ঢাকও কিনে ফেললো। পূজার আগে কলকাতায় পাড়ি দিত। আনন্দের সাথে কিছু উপরি কামাই হত। ওর হাতের বাজনার তালে প্রতিবছর বায়না হয়ে কত অজানা জায়গার অচেনা মণ্ডপে যেত ও। কিন্তু গতবছর ওর বায়না হয়নি। ওর মতন বেশিরভাগ ঢাকিরই হয়নি। কারণ এখন নাকি ঢাকের বাদ্যি মাইকে বাজে। এ বছর করোনার প্রকোপ। পুজো হবে কি তার ঠিক নেই, তায় মণ্ডপে বায়না হওয়া। তবুও সে নিজের বিদ্যে ঝালিয়ে নেবার জন্য ঢাকে কাঠি দিয়ে রোজ বোল তুলতে থাকে। আসলে শরতের আগমন তার মন থেকে পূজার গন্ধ মুছতে পারেনা।

পিন্ডারি অভিযান - সোমনাথ সিংহ রায়

রবিবার হলেই নিখিলের (বাপি) বাড়িতে বসা। আমি, চিন্তা আর মাঝেমধ্যে জীবন। মাসিমার হাতে চা আর সঙ্গে মানচিত্র আর কাগজ কলম। পরিকল্পনা সাজানো হয়ে গেলো। এবার পূজোর ছুটিতে পিণ্ডারি অভিযান। আমি, চিন্তা আর নিখিল। জীবনের চোখের সমস্য তাই প্রথমেই বাদ। পরে যুক্ত হলো পার্থ ও বিচ্ছু। পার্থ চিন্তার বন্ধু আর পার্থর বন্ধু বিচ্ছু। পার্থর সঙ্গে পূর্বালাপ থাকলেও বিচ্ছু একদম অপরিচিত আমাদের কাছে। একটু কিন্তু কিন্তু থাকলেও ওকে দলে নিলাম সংখ্যায় বাড়তে। তবে ওর নামের যথার্থতা পরে বুঝেছিলাম পদে পদে। নিখিলকে ম্যানেজার করে আমাদের পাঁচজনের টিম। প্রথমে ম্যানেজার হলেও পরে কখন যে ক্যাপ্টেন হয়েগেছে ওর কর্তাব্যক্তি সুলভ হাবভাব আর পুরোনো অলেস্টার আর হ্যাটের গুণে। ইতিমধ্যেই অন্যানা ট্রেকাররাও ওকে ক্যাপ্টেন বলে ডাকতে শুরু করেছে। আজও তিরিশ বছর বাদেও নিখিলকে অনেকেই ক্যাপ্টেন বলেই ডাকে।


অতঃপর যাত্রা শুরু নির্দিষ্ট দিনে। অমৃতসর মেলে লক্ষ্ণৌ পৌঁছে রেলক্যান্টিনে দুপুরের আহার আর আশপাশটা একটু ঘুরে নিয়ে ডিনার সারলাম মটন চাপ আর তন্দুরি রুটি সহযোগে। দামে ভীষণ সস্তা আর স্বাদেও অপূর্ব। আজও যেন মুখে লেগে আছে। তারপর আয়েশবাগ স্টেশনে নৈনিতাল এক্সপ্রেস ধরার জন্যে। সুন্দর ট্রেন। ভালো গতি আছে। ক্রমশ রাত্রি বাড়তে লাগলো সঙ্গে ঠাণ্ডাও। আমরা তখন পাঞ্জাবি টিকিট চেকারের সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত। সত্যিই ভদ্রলোক। বাংলা সম্পর্কে তার উচ্চ ধারণা আর গর্ব একজন অবাঙালির কাছে অপ্রত্যাশিত। তাই, এতো বছর পরেও তার কথা মনে রেখেছি। 

অনেকের কাছেই শুনেছি লালকুঁয়ার জিলাপি খুব বিখ্যাত তাই ভোরবেলা ট্রেন লালকুঁয়া পৌঁছতে সেই স্বাদ নিতে ভুললাম না। পরের স্টেশন হলদুয়ানি নামার পালা। তারপর ভাড়ার জিপগাড়িতে হলদুয়ানি থেকে ভারারি। ওখানেই আমাদের রাত্রিবাস। ছোট্ট শহর। একটু ঠাণ্ডাও  পড়েছে। সন্ধেবেলা ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম অনেক হোটেলে একধরনের মাছ ভাজা সাজিয়ে রেখেছে। জিজ্ঞেস করতে বললো ট্রাউট মাছ। দু-একজন বাঙালি ট্রেকার বসে খাচ্ছিলো। বললো,'খেয়ে দেখুন অপূর্ব স্বাদ। এরপর তো আর কোথাও মাছ পাবেন না।'

ঐ খানেই প্রথম ট্রাউট মাছের স্বাদ নিয়েছিলাম। সত্যিই ভালো। ওটাই প্রথম আর ওটাই শেষ। পরে আর সুযোগ হয়নি।

                         

(২য় পর্ব)

ভারারি খুব ছোট্ট একটা শহর। গ্ৰাম বললেও অত্ত্যুক্তি হবেনা। এখান থেকেই আমাদের রেশন সংগ্ৰহ করতে হবে ৬-৭ দিনের জন্যে। রেশন বলতে একটু চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি। আমরা বেরিয়ে পড়লাম রেশন সংগ্ৰহে। 

আগেই টেলিফোনে যোগাযোগ হয়েছিল, কলকাতা থেকেই চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আমরা পৌঁছাতেই একজন হাজির হলো। যেন আমাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। ২৮-৩০ বছরের ছোটখাটো দোহারা চেহারার এক যুবক একগাল হেসে পরিচয় দিলো নিজেকে আমাদের বুক করা গাইডের প্রতিনিধি হিসেবে। পূর্বনির্ধারিত ব্যক্তি, যার সঙ্গে আমাদের পত্রালাপ হয়েছিল, আসতে পারবে না অন্য একটা বড়ো ট্রিপ থাকায়। তার বদলে তাকেই পাঠিয়েছে। আমাদেরও বিস্রান সিং কে পছন্দ হয়ে গেল ওর সদা হাস্যময় মুখ দেখে। পরবর্তী কালে ওই ছয় সাত দিন ও আমাদের বন্ধু হয়ে উঠলো ওর আন্তরিকতার গুণে। 


সেপ্টেম্বরের শেষদিকে সবে ঠাণ্ডা পড়ছে। বেশ উপভোগ্য। টুকিটাকি কেনাকাটা সেরে রাতের খাবার খেয়ে আমরা তাড়াতাড়ি বিছানায় গড়িয়ে পড়লাম। আড়াই দিনের ট্রেন জার্নি তার উপর আগামীকাল সকাল সকাল বেরুতে হবে। বিস্রান ও বিদায় নিয়েছে ভোরবেলা আসবে বলে।


যাতায়াত নিয়ে মোট নব্বই কিলোমিটার পথ। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা সবাই প্রস্তুত। একমাত্র পার্থ ছাড়া। ওকে ডেকে তুলতে হলো।

বিস্রান ও হাজির। বেশ রোমাঞ্চ লাগছে। আমার ও বাপির দু একটা ছোটখাটো ট্রেকের অভিজ্ঞতা থাকলেও বাকিরা একদম নতুন। 

ঠিক ছিল প্রথমে লোহারক্ষেত হয়ে ঢাকুরি যাব। ওখানেই রাত্রিবাস। পরিবর্তন করে আরো একটা দিন বাড়িয়ে নিলাম দলের অবস্থা বিবেচনা করে।

লোহারক্ষেতেও  নয় ফেরার পথে স্টে আছে বলে আমরা সাং এই রাত্রিবাস করবো ঠিক করলাম। 

মাত্র কয়েক কিলোমিটার রাস্তা ক্রমশ চড়াই ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বুঝলাম সবাই সহজ বা বিগিনার্স ট্রেক বললেও এতোটা সহজ নয় সেটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে শুরু করলাম।

 

এবড়ো খেবড়ো পাথুরে রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম রাস্তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে। 

রাস্তার দুধারে ইতস্তত ছড়ান ছিটানো গ্ৰাম। চতুর্দিকে সবুজের সমারোহ। মিঠেকড়া রোদ আর মাঝেমধ্যেই নন্দাদেবী, নন্দাকোটের উপর ছিটকে পড়া সূর্যালোকের নয়নাভিরাম দৃশ্য পথের ক্লান্তি ভোলাচ্ছে। দেখতে দেখতে আমরা প্রথম দিনের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেলাম। একটা চাতালের মতো ঘেরা অংশে ট্রেকার্স হাটে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। বেশ চড়া রোদ্দুর মাথায় উপর। তল্পিতল্পা কাঁধ থেকে নামিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম পাইপের মাধ্যমে ঝর্ণার জল আনার ব্যবস্থা রয়েছে। কয়েকজন রোদ্দুরে তেল মেখে বসে আছে স্মান করবে বলে। দেখে আমারও ভীষণ ইচ্ছে করছে তিন দিন স্মান না করা শরীরটাকে একটু ভিজিয়ে নিতে। ধরচূঢ়া ছেড়ে আমিও সামিল ওদের সঙ্গে। সঙ্গে করে আনা সর্ষের তেল ভালো করে মেখে রোদ্দুরে গা গরম করতে বসলাম আর বন্ধু দু-এক জনের আপত্তি সত্ত্বেও গায়ে জল ঢালতেই ওরে ব্বাপ কি ঠাণ্ডা!

                                                  

(৩য় পর্ব)

 সকাল বেরিয়ে পড়লাম। সবার পিঠে রাক স্যাক। লোহারক্ষেত হয়ে ঢাকুরি টপ (২৬৮০মি.)। ১৩-১৪ কিমি রাস্তা। লোহারক্ষেত থেকেই ১১ কিলোমিটার। অভিজ্ঞরা বলেছিলেন ট্রেকিংয়ের এই অংশটা খুব চড়াই। ঢাকুরি টপ পেরিয়ে গেলেই পিণ্ডারি খুব সহজেই পৌঁছানো যাবে।

গ্ৰামের মধ্যেদিয়ে রাস্তা। রাস্তার ধারে ছোট ছোট ফুটফুটে বাচ্চাদের দাঁড়িয়ে অবাক চোখে আমাদের দেখা অথবা স্কুলে যাবার পথে হাতনাড়া এক অতিপরিচিত ও নয়নাভিরাম দৃশ্য। আমরা প্রত্যেকেই পকেট ভর্তি লজেন্স নিয়েছিলাম। গলা শুকিয়ে গেলে কাজে দেবে। দু-একটা ওদের দিকে ছুঁড়ে দিতে কি আনন্দ! যারা পায়নি তারা বললো, 'মিঠাই দে'। আবার এক আধটা ঝোপে পড়ে গেলে খোঁজার কি প্রাণান্তকর চেষ্টা। আনন্দের মাঝেও মনটা বিষাদগ্ৰস্থ হয়ে পড়লো ওদের এই সামান্য চাহিদাটুকু দেখে। মনে হয় যদি----, থাক। চলো ফিরে যাই নিজ পথে। 

এক ঘন্টা হাঁটার পর লোহার ক্ষেত(১৭০৮ মি) পৌঁছে গেলাম। একটু বিশ্রাম, চা পান তারপর পথচলা। সামনে নন্দাদেবি আর নন্দাকোট আমাদের পথ চেনাচ্ছে। মাঝে মধ্যে পিণ্ডারীর ক্ষীণধারা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। আবার হারিয়েও বাচ্ছে। চারিদিকে হরিদ্রাবর্ণ আর নাম না জানা ফুল সঙ্গে পাখির কুজন আমাদের শহুরে মনে ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করেছে। সত্যি প্রকৃতি কি অপরূপ!

পার্থ একটা ছোট্ট রেকর্ডপ্লেয়ার চালিয়ে মনের আনন্দে শিষ দিতে দিতে হাঁটছে। এটাই ওর প্রথমবার ট্রেকিং। আমরা ওর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, 'বুঝবে খুড়ো বেলা হলে!'


রাস্তা ক্রমশঃ চড়াই হচ্ছে। বেশ কষ্টকরও। হাঁটার গতিও কমে আসছে। ইতিমধ্যেই অর্ধেক রাস্তা পেরিয়ে এসেছি। সামনে পড়লো ঢাকুরি খাল(২৫৪০ মি.)। পারাপারের জন্যে একটা রডোডেনড্রনের বিরাটাকার কাণ্ড একমাত্র উপায়। কোন সাপোর্ট নেই। অনেকটা নীচে ক্ষীণ জলধারা। দেখে মাথা ঘুরে গেল। ভাবলাম যাত্রাপথের এখানেই ইতি। আমাদের সাহস দিতে কয়েকটি অল্পবয়সী ছেলে অবলীলাক্রমে পেরিয়ে গেল। দু-এক জন আবার ফিরেও এলো। আমরাও সাহস করে বিস্রান সিং এর সাহায্যে একে একে পেরিয়ে গেলাম। পরে জেনেছি ওই ছেলেগুলো হাওড়া থেকে এসেছে। আরো পরে জেনেছি কোন একটা অভিযানে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে হারিয়ে যায়।

রাস্তায় আমাদের দল বাড়তে লাগলো। বসন্ত বসু (ওকে সবাই বাসু বলেই ডাকে) আর সন্দীপ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। এখন আমরা সাত জন।

রাস্তার ধারে ওক আর রডোডেনড্রনের আধিক্য।

এটা ফুলের সময় নয়। কিন্তু বিশাল বিশাল ঋজু গাছ যেন আমাদের ব্যারিকেড করে দাঁড়িয়ে।

চড়াই ভেঙ্গে এগুতে এগুতে আমরা সবাই শ্রান্ত। পার্থর আনন্দ এখন ক্রন্দনে পরিণত প্রায়। ওকে এই কষ্টের বিষয়টা না জানিয়ে নিয়ে আসার জন্যে আমাদের দোষী করে গালিগালাজ করছে। 

এদিকে ক্ষিদেও পেয়েছে। শুকনো খাবার আর লজেন্স মুখে নিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে। যদিও বুঝতে পারলাম প্রায় এসে গেছি কিন্তু পা আর চলছে না। দম ও শেষ। মনে হচ্ছে আর পারবো না। মনে পড়লো একজন বলেছিলেন যখন দেখবে আর পারছো না তখনই ঠিক পৌঁছে গেছো। মনে মনে এই কথাটা স্মরণ করে শেষ কয়েকশো মিটার এগিয়ে চললাম হামাগুড়ি দিয়ে। মাথা নিচুতে নেমে গেছে। কোনক্রমে মাথা তুলে দেখি একি, স্বপ্ন দেখছি নাকি? কোথায় ক্লান্তি! সামনেই এক প্রশস্ত সবুজ চাতাল আর তার ওপারে আমাদের স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে শ্বেতশুভ্র চৌখাম্বা (আমার মতে গাড়োয়াল কুমায়ূন রেঞ্জের সবচাইতে সুন্দর ও উজ্জ্বল চূড়া)।


নিমেষেই সব ক্লান্ত শেষ। আমরা চতুর্দিকে সুউচ্চ চূড়ায় ঘেরা এই সবুজ উপত্যাকাকে উপভোগ করতে করতে তাঁবুতে প্রবেশ করলাম। বিস্রান রান্নার জোগাড়ে ব্যস্ত। অনেকগুলো দল এসেছে। আমরা ঠিক করলাম একসঙ্গেই রান্না হবে। তাতে শ্রম ও জ্বালানির সাশ্রয়। সবাই হাত লাগাতে রান্নাও হলে গেল তাড়াতাড়ি। রান্না বলতে খিচুড়ি আর আলু মরিচ। এদিকে পেটেও ছুঁচোর ডনবৈঠক। আর তর সইছে না। খেতে বসার আগে মনে পড়লো আমাদের কাছে পাঁপড় আছে। বের করতেই সঙ্গে সঙ্গেই সেঁকে চলে এলো।

সবাই যখন খাচ্ছি একজন বললো আমার কাছে মাখন আছে। আমাদের জীবনের অন্যতম একটি সুন্দর বনভোজন ইত্যবসরে হয়ে গেলো।


নন্দাদেবি, নন্দাকোট আরো অনেক অনেক অজানা পর্বতশৃঙ্গ বিশেষ করে চৌখাম্বার দিকে

তাকিয়ে থাকতে সন্ধ্যা নেমে এলো। সূর্যাস্তের আলোকচ্ছটায় চূড়াগুলি হয়ে উঠেছে রক্তিম।

এক সর্গীয় দৃশ্য। সারাটাজীবন স্মৃতিতে ধরে রাখার মতো। 

আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা বাড়ছে। আমরা তাঁবুতে আশ্রয় নিলাম। ভিনার রেডি। বিস্রান জানিয়ে গেল। নিখিলকে দেখলাম বাইরে যাবার জন্যে উসখুস করছে। আমারও ইচ্ছেটা চাগান দিলো। আস্তে আস্তে দুজনে তাঁবুর বাইরে এলাম। বেশ ঠাণ্ডা। পূর্ণীমার রাত। আমরা চাকুরিতে কোজাগরী পূর্ণিমা কাটাবার প্ল্যান আগের করেছিলাম। আকাশ জুড়ে চাঁদ উঠেছে। পরিস্কার আকাশ। পাহাড়চূড়ায় ঠিকরে পড়া চন্দ্রালোকের এই শোভা ইহজীবনে ভুলবো না। আমরা সন্মোহিত। লক্ষ্য করলাম নিখিল গ্ল্যাভস ও মাঙ্কি ক্যাপ খুলছে। ওর মতো অ-কবিরও এই কাব্যিক রূপ আমাকেও প্রভাবিত করলো। বললো, চ' আমরা হ্যাটস অফ জানাই প্রকৃতিকে!' আমি নিখিলকে অনুসরণ করলাম। কতক্ষণ এই অবস্থায় ছিলাম জানিনা। সম্বিত ফিরলো অন্যদের বকাঝকায়।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরে এলাম তাঁবুতে। 

                                                  

(৪র্থ পর্ব)

এবার বেশ কিছুটা উৎরাই তার পর প্রায় সমতল পায়ে চলা রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চললাম খাতির (২২১০ মি.) দিকে। অনেকটা রাস্তা হলেও এই পর্যায়ে সবচেয়ে সুন্দর বৈচিত্র্যময় যাত্রা। রাস্তার দুধারে পাহাড়ের গা বেয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ওক, রডোডেনড্রন আর মাঝেমধ্যে নানা ধরণের ফসলের ক্ষেত। হয়ে আছে নানা ‌বর্ণের সবজি।

বোঝাযায় আশেপাশে মানুষের বসতি আছে। দেখাও যাচ্ছে দু-একটি বাড়ি দুরে দুরে একটু ছাড়া ছাড়া অবস্থায়। অনেক নীচু দিয়ে  পিণ্ডারি ও সুন্দরডোঙ্গা নদী তিরতির করে বয়ে চলেছে। রাস্তায় পড়ছে অসংখ্য ঝর্ণা। অতিক্রম করে আমরা এগিয়ে চলেছি গন্তব্যের দিকে। দ্বিপ্রহরিক আহার সারা হলো এমন একটি ঝোরার ধারে। ক্ষণিক বিশ্রাম নিয়ে আবার পথ চলা। চলতে চলতে অন্যেরা এগিয়ে গেছে দেখে আমি চেষ্টা করলাম পাকদণ্ডী বেয়ে ওদের নাগালে পৌঁছতে আর ওখানেই করে ফেললাম এক মারাত্মক ভুল। দেখলাম রাস্তাটা অবরুদ্ধ একটা বড়ো গর্তের মতো থাকায়। এপাশ ওপাশ তাকিয়ে কোন উপায় না দেখে ভাবলাম এটা পেরিয়ে গেলেই রাস্তা মিলবে। যা ভাবা তাই-

একটা পাথরে পীঠ রেখে নেবে পড়েই চক্ষু চড়কগাছ। বেরুবার রাস্তা নেই। কারো সাহায্য ছাড়া বেরোতেও পারবোনা। খুব ভয় পেয়ে গেলাম। সবাইতো এগিয়ে গেছে কে উদ্ধার করবে আমায়। দুএকবার পাথর বেয়ে ওঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। এক্ষেত্রে রক ক্লায়িম্বিং এর প্রাথমিক শিক্ষা ব্যর্থ। অগত্যা অন্য উপায় খোঁজার চেষ্টা। দেখলাম একটি সুড়ঙ্গের মতো রয়েছে। ওপারে আলো দেখা যাচ্ছে। হয়ত পশুপাখিদের যাতায়াতের রাস্তা। আর কোন উপায় না দেখে বুকে হেঁটে ইষ্টনাম জপ করতে করতে পেরিয়ে গেলাম ওই সুড়ঙ্গ। না, এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম। 


সামনে জঙ্গলের পথ আর আমি প্রায় একা হয়ে পড়েছি। সঙ্গীরা নিশ্চয়ই অনেকটা এগিয়ে গেছে। দেখলাম আমার মতোই ধীর গতিতে দুজন আসছেন। ওনারাও দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। কলকাতায় থাকেন, স্কুল শিক্ষক।  আমাকে দেখে বললেন, 'ভালোই হলো আপনাকে পেয়ে। জানেন তো এই পথে খুব ভালুকের উপদ্রব?' আমি মনে মনে বললাম, 'ব্যাটা ভালুকের হাত থেকে বাঁচতে আমায় সঙ্গী চায়!'


রাস্তায় এই প্রথম আঞ্চলিক মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো। মা আর সঙ্গে অষ্টাদশী কি দ্বাবিংশতি কন্যা। আলাপ করার লোভ সামলাতে পারলাম না। পকেট থেকে লজেন্স বের করে দিতে গিয়ে দেখলাম কন্যার সলজ্জ চাউনিতে বিদ্যুৎ ঝলক। কালো হরিণীর মতো চোখ। রোদেপোড়া শ্যাম বর্ণ, দীর্ঘাঙ্গী, মেদহীন চেহারায় এক দুর্ণীবার আকর্ষণ, মাটির গন্ধ মাখা। প্রেমে পড়ে গেলাম। 

হৃদয় বললো, 'এখানেই বাঁধো নীড় ক্লান্ত পথিক, এইতো তোমার শ্যামা!' 

কিন্তু যা হবার নয় তাই নিয়ে ভেবে লাভ কি? জিজ্ঞেস করলাম রাস্তায় কোথাও চা পাওয়া যাবে কিনা? বয়স্কা বললেন সামনেই আছে। তারাও ওই দিকে হয়েই যাবে। কিছুটা এগোতেই পথের ধারে চায়ের দোকান। দেখিয়ে দিয়ে চলে যেতে চাইলে আমি ওদের আমাদের সঙ্গী হতে বললাম। নিমরাজি হয়েও একসাথে চা খাওয়ার পর ওরা উঠে পড়লো। হাত নেড়ে বিদায় নিয়ে আস্তে আস্তে দৃষ্টির অগোচরে চলে গেল। আমার চোখ ওদের যাত্রাপথের দিকে।


একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি উঠে পড়লাম দুই অতিথিকে সঙ্গী করে। বরুনদেব অস্তমিত প্রায়। পাখিরা ক্লান্ত হয়ে নীড়ে ফিরছে। চারিদিকে বিহঙ্গের কুজন। পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসা রূপালী ধারার নয়নাভিরাম দৃশ্য আমাদের চলার গতিকে আরো স্লথ করে তুলেছে। হোক না বিলম্ব এই দৃশ্য কি বারবার কপালে জোটে! 

আর নতুন সঙ্গীদ্বয় ভালুকাতঙ্কে আমার কাছছাড়া হচ্ছেনা। ওদের এই আচরণ বেশ উপভোগ্য লাগছে। 

পথে হলো দেরি। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। এবার একটু গা ছমছম ভাব। ভাবছি টর্চের আলোয় পথ চিনতে ভুল হবে না তো? হঠাৎ দেখি অন্ধকার ফুঁড়ে সাক্ষাৎ দেবদূতের মতো বিস্রান হাজির। আমার দেরি হচ্ছে দেখে ও অন্যদের ছেড়ে দিয়ে আমায় নিতে এসেছে। মনটা ভরে গেল। কলকাতা থেকে এই সুদুর উত্তরাখণ্ডের প্রত্যন্ত প্রান্তে এসে যেন পরম আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা। সত্যিই ওরা কত আন্তরিক!

অন্যেরা অনেক আগে পৌঁছে গেছে। সবার আগে চিন্তা (বিশ্বজিৎ) লম্বা লম্বা পা ফেলে পৌঁছে গেছে এবং ট্রেকার্স হাটে এসে জায়গা বুক করেছে। আমায় দেখে ঝাঁঝিয়ে উঠলো, 'কিরে এতক্ষণ ধরে কি করছিলি? আমি কখন সেই তিনটের সময় এসে গিয়েছি। এখন ঘড়ি দেখ সাতটা বেজে গেছে।' 

আমি মেনে নিলাম। রাস্তার কথা বলা যাবেনা। চিন্তা আমার পাড়ার ছেলে। চর্তুদিকে রাষ্ট্র হয়ে যাবে!  

                                       

(৫-ম পর্ব)

আজ একটু দেরি করে বেরুবো। চিন্তার রাতে জ্বর হয়েছে। মনে হয় রাস্তায় অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করার জন্যে। আমি একটু গতকালের বদলা নিয়ে নিলাম। বললাম, 'এখানে কোন প্রতিযোগিতায় আসিনি, প্রকৃতিকে উপভোগ করতে এসেছি। স্লো বাট স্টেডি।' 

ট্রেকার্সহাটটি বেশ সুন্দর। দোতলা কাঠের বাড়ি। আশেপাশে বেশ কিছু বাড়ি ঘরদোর, দোকানপাট আছে। খুব সুন্দর সাজানো গোছানো গ্ৰাম। হিমালয়ের এতোটা গভীরে ভাবা যায়না। এই সুযোগে আশপাশটা একটু ঘুরে ফিরে নিলাম।

 

আজকের আমাদের গন্তব্য ফুরকিয়া ভায়া দোয়ালি। খাতির থেকে দোয়ালি ৮ কিমি আর দোয়ালি থেকে ফুরকিয়া ৫ কিমি পথ। অর্থাৎ মোট ১৩, কিমি পথ।

বেরুবার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে প্রথমেই বিপাক। পার্থ ভুল করে আমার ইনার পরে বসে আছে। ওরটা ভিজে। অগত্যা বিকল্প ব্যবস্থা।

শুরু হলো আজকের অভিযান। বেশ সহজ যাত্রাপথ। শুরু থেকেই আমাদের যাত্রাপথের সঙ্গী খরস্রোতা পিণ্ডার। এই নদী পিণ্ডারি হিমবাহে উৎপন্ন হয়ে কর্ণপ্রয়াগে অলকানন্দার সঙ্গে মিশেছে। রাস্তায় অসংখ্য ঝর্ণা পেরুতে হয় খুব সাবধানে। না হলে বিপদ আছে। দেখতে দেখতে একটা প্রশস্ত জায়গায় পৌঁছে দুপুরের আহারের জোগাড়। সামনে খাড়া একটা বিরাট পাহাড়। এটাকেই টপকাতে হবে! বুকটা দুরুদুরু করে উঠলো। পারবো তো? না শুধু ওই পাহাড়টাই নয় পরে আর একটা পাহাড় ও টপকাতে হলো। পৌঁছে গেলাম দোয়ালি। খুব ছোট্ট একটা ঢালের মতো জায়গা। এখান থেকে কাফনি হিমবাহ (৩৬৬০ মি.) ট্রেকিং শুরু হয়। ফেরার সময় এখানে থাকবো বলে দোয়ালি ছাড়িয়ে এগিয়ে চললাম ফুরকিয়ার দিকে।  ওখানেই রাত্রিবাস। সঙ্গী পিণ্ডার আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্বেতশুভ্র নন্দাখাত(৬৫৪৫মি.)

এছাড়া সারা রাস্তা আমাদের সঙ্গী গোলাপী রডোডেনড্রন (অবশ্য এখন ফুলের সময় নয়)। যত উপরে উঠছি ততই রুক্ষতা বাড়ছে। গাছও বিরল হতে লাগলো। 

পড়ন্ত বিকালে আমরা ফুরকিয়া (৩২৬০মি.) পৌঁছে গেলাম। প্রথমেই আমাদের আজকের আস্থানা পি.ডব্লিউ.ডি-র  পুরোনো কাঠের বাংলো। বাংলো না বলে বিশাল একটা হলঘর বললেই হয়। কাঠের মেঝেতে ঢালাও শোবার ব্যবস্থা। আর দেখার মতো একটা বড়ো ফায়ারপ্লেস আছে। মালপত্র রেখে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বিস্রান প্রাণান্তকর চেষ্টায় আগুন জ্বালিয়ে চায়ের ব্যবস্থ্যা করত মগ্ন। ইত্যবসরে গোধূলির আলোয় প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি কে চোখ ভরে দেখে নেওয়া। অনেকগুলো ছয় হাজার মি. অধিক উচ্চতার শৃঙ্গ যেমন নন্দাদেবী পূর্ব (৭৪৩৪মি.), নন্দাখাত (৬৬১১মি.) বলজুরি(৫৯২২মি.), মাইকতোলি (৬৮০৩ মি.), পাওয়ালি দোওয়ার (৬৬৬৩মি.) সম্মুখে দৃশ্যমান হয়ে এক স্বপ্নের জগত সৃষ্টি করেছে। গোধূলির রং পাহাড় চূড়ায় প্রতিফলিত হয়ে এক স্বর্ণাভ বর্ণছটায় ভরিয়ে দিয়েছে। এই অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করতে করতে গরম চা চলে এলো। আমাদের সকলের হাতে ধূম্রউদ্গারিত গরম চা আর ঝুরিভাজা (বাপি আর পার্থর খাতি থেকে সংগ্ৰহ করে আনা)। উল্লেখযোগ্য এই কদিন আকাশ একদম পরিষ্কার, একদিনও প্রকৃতি বিরূপ হয়নি। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। অন্ধকার ‌নেমে আসছে। ঠাণ্ডাও কামড় বসাচ্ছে।‌ আমরা হাটে ঢুকে গেলাম। আগামীকাল খুব ভোর ভোর বেরোতে হবে বলে রাতের খাবার তাড়াতাড়ি  খেয়ে আমরা স্লিপিং ব্যাগে আশ্রয় নিলাম। রাত্রে পারদ হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেলো। একে অক্সিজেনের ঘাটতি তার উপর ফায়ারপ্লেস চালু। বেশ কষ্টকর রাত।

শ্বাসকষ্টের মধ্যেই আগামীকালের‌ স্বপ্নে রাত পেরিয়ে গেল।


সূ্র্য ওঠার আগেই আমরা রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ৫ কিমি রাস্তা পুরোটা চড়াই। অবশ্য অর্ধেক রাস্তা পেরুতেই পাইলট বাবার আশ্রম। আশ্রম বললে ভুল হবে। কতকগুলো পাথর সাজিয়ে একটা গুহার মতো। কথিত আছে কোন একজন পাইলট নাকি শেষ জীবনে সাধু হয়ে এখানে স্থান নেয়। পিণ্ডারি অভিমানে আসা ট্রেকারদের একটু পরিসেবা দেওয়া ছিলো ওনার লক্ষ্য। উনি মারা যাবার পরেও ওনার শিষ্যরা এই পরিসেবা অব্যাহত রেখেছেন। যাইহোক ওখানে আমাদের গরম চা মিললো। একটি অল্পবয়সী ছেলে এখন আশ্রমের দায়িত্বে। সেই আমাদের পাথরের বাটিতে চা দিল। বিনিময়ে কিছু দিতে গেলে প্রত্যাখ্যান করলো। সেবার বিনিময়ে কিছু নেওয়া বাবার নিষেধ আছে। অনোন্যপায় হয়ে চূড়ান্ত নাস্তিক বাপি একটা পাথরের গায়ে খোদাই করা মূর্তির সামনে প্রণামি হিসেবে কিছু টাকা রেখে পাথর চাপা দিয়ে বললো, 'কিছু দিতে হলে এদেরকে দিতে হয়। এরা নিঃস্বার্থ ভাবে মানুষের সেবা করে। এতটা উচ্চতায় জনমানবহীন প্রান্তরে এই ত্যাগ, ভাবা যায়!'

রাত্রের পড়া বরফ এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পথে। সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। এমনি একটা খরস্রোতা ঝোরা পেরুতে গিয়ে পাথরের উপর বরফের আস্তারণে পা হড়কে চিন্তা চিৎপটাং। অবশ্য পিঠে রাকস্যাক থাকায় এ যাত্রায় রক্ষা পেলো। আঘাতটা ওটার উপর দিয়েই গেলো।

পৌঁছে গেলাম পিণ্ডারি হিমবাহের  (৩৬৬০ মি.) লেজের কাছে অর্থাৎ '০' পয়েন্টে। তিন কিলোমিটার লম্বা আর ৩৬৫ মি. চওড়া হিমবাহটি অশ্বখুরাকৃতি। নীচে পিণ্ডার নদীর উৎসমুখ পরিলক্ষিত হচ্ছে। পূর্ব উল্লিখিত পর্বত ছাড়াও ছাঙ্গুচ (৬৩২২ মি.), ছোট ছাঙ্গুচ হিমবাহটিকে বেষ্টন করে আছে।  বিরল এই ভয়ঙ্কর সুন্দর প্রকৃতির রূপে আমরা সন্মোহিত। সম্বিত ফিরলো ক্যাপ্টেন ওরফে নিখিল ওরফে বাপিকে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যেতে দেখে। খুবই বিপদসংকুল ঢালের উপরদিয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে নীচু হয়ে পর্যবেক্ষণ করে ও ফিরে এলো। ফিরে এসে বললো একবারইতো আসা তাই পিণ্ডার নদীর উৎসমুখটা একটু ভালো করে দেখে নেওয়া! 

                                  

(৬ষ্ট ও শেষ পর্ব)

ঘুটঘুটে অন্ধকারে কুপীর আলোয় প্রায় না দেখতে পাওয়া কলাইয়ের থালায় রুটি আর দুম্বার মাংস। এই ছিলো সেই রাতের পরম উপাদেয় ডিনার। কে যেন খবর এনেছে একটা দুম্বার মাংস কাটা হয়েছে। সব ট্রেকারদের রাতের নেমতন্ন সামান্য মূল্যের বিনিময়ে। ভাঙাচোরা একটা খোলার চালের আচ্ছাদন। এটাই হোটেল এখানেই রাতে খাবারের ব্যবস্থা।


পিণ্ডারিকে আলবিদা জানিয়ে ফিরে আসা দোয়ালি (২৫৭৫ মি.) তে। ফেরার পথে আজ এখানেই আমাদের রাত্রিবাস। ট্রেকার্সহাটে জায়গা মিললো না। মন্দের ভালো একটু দুরবর্তী তাঁবুতে সংকুলান। আসার সময় খাতিতে ছিলাম তাই ফেরার সময় দোয়ালিতে। 


সবাই খূব উৎসাহী অনেকদিন বাদে আমিষ জুটবে। ব্যতিক্রমী আমি কারণ মাংস কোনদিনও আমার পছন্দের খাদ্য নয়। বরঞ্চ একটু ঘেন্না ঘেন্না করে খাওয়া। খেতে গিয়ে আজকেও ঘেন্না করতে লাগলো। শুনেছি দুম্বার পিছনের অংশের বৃদ্ধি কেটে নিয়ে রান্না করা হয়। খেতে খুব সুস্বাদু। যাইহোক আমি খাচ্ছি না দেখে একজন বলে উঠলো, 'কি হলো আপনি খাচ্ছেন না যে?' আমি খাবোনা বলতেই ছোঁ মেরে আমার পাত থেকে  মাংসের অবশিষ্টটা চালান করে দিল নিজের পাতে। অন্ধকারেও চিনতে পারলাম। সেই দুজন  স্কুল শিক্ষক, ঢাকুরি থেকে খাতি যাবার সময় ভাল্লুকের ভয়ে একবারও আমার সঙ্গ ছাড়েনি! 


ভোরবলা ওঠা ও সারাদিন হাঁটার ফলে  সবাই প্ররিশ্রান্ত ছিলাম। শ্লিপিং ব্যাগে ঢুকে শুয়ে পড়লাম। ঘুমিয়েও পড়লাম অচিরেই। হঠাৎ মাঝরাতে এক ভয়ংকর ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। চতুর্দিকে এক গুম গুম বিকট শব্দ। সমস্ত কিছু যেন ওলোটপালট হয়ে যাচ্ছে। কি হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছি না। একবার ভাবলাম ভাল্লুক ঢুকেছে। পাহাড়ী ভাল্লুক বড় ভয়ংকর। পরে মুহুর্তে মনে হলো না, চিন্তার অল্টিচ্যুভ সিকনেস থেকে জ্বর এসেছে মনে হয়। ওই বোধহয় কাঁপছে বলে তাঁবুটাও কাঁপছে। পরক্ষনেই মনে হলো নিখিল মাঝখানে শুয়েছে। ওর খাটো উচ্চতার জন্যে খুঁটিতে পা লেগে তাঁবুটা এতো কাঁপছে। বাইরে একসঙ্গে হাজারটা বোমা ফাটার আওয়াজ ক্রমশ বাড়ছে। টর্চটাও কোথায় খুঁজে না পেয়ে একে একে সবার নাম ধরে ডাকলাম। কোন সাড়া নেই। অতঃপর আমাদের পোর্টার কাম গাইড বিস্রান সিং এর নাম ধরে চিৎকার করে উঠলাম "বিস্রান এ ক্যা হো রহা"হ্যায়?" দুর থেকে অস্পষ্ট উত্তর ভেসে এলো,"ভূকম্পন"। 

ভয়ে, আতংকিত দিশেহারা হয়ে মনে হলো ছুট লাগাই। পরক্ষনেই মনে হলো কোথায় যাব? বিপদ তো সর্বগ্ৰাসী! পাহাড়টার যদি ধ্বসে যায় নিরাপদ আশ্রয় কোথায়? ভাবলাম দৌড় ঝাঁপ করে লাভ নেই তাতে বিপদ আরো বাড়বে। অন্ধকারে কোথায়ইবা যাবো? চর্তুদিকে খাদ।

অন্যথায় বিশাল বিশাল রডোডেনড্রন চাপা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। বনঞ্চ, তাঁবুর অবস্থানও হয় অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায়। তাহলে ভাগ্যে যদি থাকে মৃত্যু কে আলিঙ্গন করে নেওয়া ভালো। একটা প্রশান্তি নেমে এলো মনে। আমার প্রিয়জন সবাই একে একে ভেসে উঠলো চোখের সামনে। মা, বাবা, ভাই বোন বন্ধুবান্ধবদের কাছে বিদায় নিলাম।

"বিদায়! চললো তোমাদের এই অবাধ্য ছেলে"।


শ্লিপিং ব্যাগে নিজেকে ভালো করে ঢুকিয়ে চেন আটকে দিলাম। নাকটুকু খোলা রাখলাম যাতে দমবদ্ধ অবস্থায় মরতে না হয়! তারপর এক গভীর ঘুমে ঢলে পড়লাম।


পরদিন ঘুম ভাঙলো মুখে সূর্যের আলো পড়ে। আস্তে আস্তে চোখ খুললাম। দেখলাম আমি খোলা আকাশের নিচে। তাঁবু উধাও। আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে চেনা পরিচিত অনেকগুলো মুখ। আমি ধড়ফড় করে উঠে বসতে চাইলাম। তখনি চারিদিক থেকে আওয়াজ উঠলো "বেঁচে আছে! বেঁচে আছে!"

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম 'কেন? কি হয়েছিল?" 

সঙ্গীরা সবাই মিলে ধমকে উঠলো, "তুই কি করছিস?" 

বললাম, "ঘুমোচ্ছিলাম তো!"

আবার ধমক, "ঘুমোচ্ছিলি! সারারাত আমাদের হার্টফেল হবার জোগাড় আর তুই ঘুমোচ্ছিস, তাকিয়ে দেখ তুই কোথায় শুয়ে আছিস! তুই কি মানুষ না অন্য কিছু?"

তাকিয়ে দেখি কি সর্বনাশ! আমি যেখানে শুয়ে আছি তার দেড় দু'হাত দুর থেকে পাহাড়টাই নেই আর আমি শুয়ে আছি একদম কিনারায়!

পরে শুনেছিলাম বাপিও নাকি ঘুমিয়ে পড়েছিল। 


আজকের কাফনি হিমবাহ অভিযান বাতিল করতে হলো গতকালের মারাত্মক ভূমিকম্পের পর। অগত্যা নেমে যাওয়া। রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। বিভিন্ন জায়গায় পায়ে চলার পথটুকুও প্রায় নেই বললেই চলে। ভীষণ বিপদসংকুল হয়ে উঠেছে। ক্যাপ্টেন আর চিন্তা অনেকটা এগিয়ে গেছে। মাঝে পার্থ ও বিচ্ছু দেওয়াল ধরে ফেলেছে। অর্থাৎ, পাহাড়ের গা ঘেঁষে কোন রকমে এগুচ্ছে। গোদের উপর বিষ ফোঁড়া পার্থর জুতো ছিঁড়ে গেছে। অন্যদের সাহায্য নিয়ে কোন ভাবে চালাচ্ছিল। ওদের পিছনে আমি আমার পিছনে বাসু ও সন্দীপ। আরো পিছনে বিস্রান সিং সবার বাড়তি বোঝা ওর ঘাড়ে। বেচারা বিশাল ভার নিয়ে ধীরে ধীরে আসছে। অনুভব করলাম এই অবস্থায় ওরা বিশেষ করে পার্থ কিছুতেই যেতে পারবে না। আবার ওদের জন্যে অন্য ট্রেকাররাও আটকে পড়েছে, এগুতে পারছে না। অনোন্যপায় হয়ে ওদের সাহস জোগাতে ট্রেকিংয়ের নিয়মবহির্ভূত ভাবে ওদের টপকে গেলাম। সামনেই রাস্তায় একটা বাঁক অনেকটা 'ভি' আকৃতির। খুব বেশি হলে ৩ থেকে ৪ ফুট চওড়া হবে। ওদের পক্ষে পার হওয়া অসম্ভব। সুতরাং এগিয়ে গিয়ে বাপিকে পিছন থেকে ডাকলাম। চিন্তা অনেকটা এগিয়ে গেছে ওকে পেলাম না। তারপর যে কাজটা করলাম সেটা এখন ভাবলেও শিউরে উঠি! বাঁদিকে পাহাড়, ডানদিকে  প্রায় পাঁচ হাজার ফুট গভীর খাদ, তাকালে মাথা ঘুরে যায়, পায়ের নিচে আলগা নুড়ি। আমরা খাদ পিছনে রেখে শূণ্যে ওয়াল করে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পায়ের তলায় একটু একটু করে নুড়ি সরছে, ওদের সঙ্গে একটু স্পর্শ হলেই আমরা চিরকালের মতো হারিয়ে যাবো। না, তেমন কিছু হলোনা। ওরা সাহস ফিরে পেয়ে একে একে পার হয়ে গেল। তারপর আমাদের জড়িয়ে ধরে আবেগ আপ্লুত হয়ে বললো, 'তোদের এই ভূমিকা কোনদিন ভুলব না। তোরা আমাদের নতুন জীবন দিলি।' পার্থ আমাকে বললো, 'তোর সঙ্গে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি তারপরও এই প্রতিদান!' তোদের এই ভূমিকার কথা আমি জনে জনে বলবো।' আর আমাদের লজ্জায় ফেলে দিয়ে ও এই কর্মটা কলকাতায় না ফেরা পর্যন্ত করেই গেল।


ক্লান্ত, বিদ্ধস্ত অবস্থায় আমরা পূর্ব নির্ধারিত লোহারক্ষেতে(১৭০৮মি.)  পৌঁছে গেলাম। অনেকটা রাস্তা। যাবার সময় দুদিন লেগেছিল।

ফেরা এক দিনে।

ট্রেকার্সহাট টি বেশ সুন্দর। রাত্রে খুব ভালো ঘুম হলো। বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠে চা, প্রাতরাশ সেরে দাড়ি কাটার সরঞ্জাম নিয়ে বসলাম। দু একজন আওয়াজ দিলেও তারাই আবার আমার রেজার চেয়ে নিয়ে বসে পড়লো। তারপর কলের গরম জলে ভালো করে শ্যাম্ফু করে স্নান সেরে উঠতেই বিন্দাস। সমস্ত ক্লান্তি উধাও। এবার বিস্রানকে বিদায় দেবার পালা। সবার চোখে জল এসে গেল। বিস্রানও কেঁদে ফেললো। এই কদিনে ও আমাদের একজন হয়ে উঠেছে। ওর প্রাপ্য ও সাধ্যমত বখশিশ দিয়ে বিদায় জানাতে গিয়ে দেখি ও আমার জুতোর দিকে তাকিয়ে আছে। জুতোজোড়া Adidas এর হলেও বেশ পুরোনো এবং আমার ভাইয়ের বাতিল করা। ওর পায়ের জুতোর অবস্থা করুন। সবাই মিলে জুতো কেনার জন্যে কিছু বাড়তি টাকা আর আমার জুতোটা ওকে দিয়ে দিলাম। ওর মুখটা উজ্বল হয়ে উঠলো। যতটা টাকা পেয়ে তার থেকেও পুরোনো জুতো পেয়ে। সত্যি কি সামান্য চাহিদা!বাকি কটা দিন আমিও চপ্পলেই চালিয়ে নিতে পারবো।


ফেরার পথে প্রথমে কৌশানি। ওখানেও বিড়ম্বনা। পরেরদিন রাষ্ট্রপতি আসার কথা তাই সব বন্ধ। হোটেলে জল না পেয়ে পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে ঝর্নার (নালা কিনা জানিনা!) জলে স্মান সারতে হলো। বিকালে ম্যাল থেকে (আমাদের দেখে আসা) চূড়াগুলো আকর্ষণহীন মনে হলো। পরদিন রানীক্ষেত। ওখানে দেখা হয়ে গেল আমাদের এক বন্ধুর দিদি, বিখ্যাত হস্তরেখাবিদ্ পারমিতাদি, জামাইবাবু ও ভাগ্নের সঙ্গে। আমরা একই হোটেলে উঠেছি। অনেকদিন বাদে পরিচিত মানুষ পেয়ে আড্ডা জমে উঠলো। অনেকে হাত দেখাতে চাইলেও আমারা মানে আমি, চিন্তা, বাপি উৎসাহ না দেখানোয় অন্যদের ইচ্ছা পূরণ হলোনা। ওদের কাছেই জানলাম ভূমিকম্পের ভয়াবহতার কথা। উত্তরকাশী নাকি ধ্বংস হয়ে গেছে! যারা পাহাড়ে গেছে তাদের বাড়িতে ভীষণ আতংক। 

আমাদের মধ্যে পার্থ ছাড়া কারো বাড়িতে টেলিফোন নেই। পার্থর বাড়িতে ফোন করতেই  অপরপ্রান্ত থেকে একটা আনন্দের ঢেউ এ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেল! আবার শোনা গেল 'বেঁচে আছে বেঁচে আছে!' ক'দিন ধরে নাকি আমাদের বাড়ির লোকেরা রাইটার্স বিল্ডিং আর লালবাজার করেছে। কোন খবর পাইনি। সবাই শোকে মূহ্যমান। ধরে নিয়েছে আমরা হয়ত আর ফিরবো না। শুধু শ্রাদ্ধের কাজটাই বাকি! বুঝতে পারলাম ভূমিকম্পের ভয়াবহতা! সত্যিই তবে আমরা বেঁচে আছি! 

ইচ্ছে থাকলেও ফেরার উপায় নেই। ফিরতি ট্রেনের টিকিট এখনো তিনদিন বাদে। তাই নৈনিতালে তিনদিন উৎকণ্ঠার মধ্যেও হৈহৈ করে কাটিয়ে পাহাড়কে বিদায় জানিয়ে কাঠগুদাম থেকে বাগ এক্সপ্রেসে চড়ে বসা।  

             *********সমাপ্ত**********

শারদ প্রাতে - চাঁদ রায়

শারদ সকালে

শিশির--জলে

       নাচে ধান গর্ভে, 

আগমনী গান

ছান্দসিক তান

        বাঁচে প্রাণ গর্বে।

মেঠো আল পথ

বিন্দু বিন্দু কত

   শিশিরে সবুজে চাষী

সাদা কাশ  ফুল

পাকা মাথা চুল

   নদী যেন কত খুশী। 

শিউলি ফুটেছে

আধেক সে গাছে

  গন্ধেতে ভ্রমর মাতে

শীতল বাতাস  

শারদ আকাশ

   মনোরমশারদপ্রাতে।

**        **       **     ** *

নীল আয়োজন - সম্পা পাল

নীল আয়োজন

স্বপ্ন এখন কেমন আছে ?
তারপর কি ঘুম এসেছিল ?

বছর হয়ে গেল ঘুম স্টেশনের ব‍্যালকোনিতে 
এখনও একটি পরিচিত রোদে শীতের শিহরণ
ঘন্টা, মিনিট জেগে যায় পাথর পড়ার আওয়াজে
গল্পের শুরু এখানেই, পশমিনা শাল গায়ে

 জুলাই এখনও অনন্ত অনুভব
অমিত লাবণ্য ভিজেছিল এই বৃষ্টিতেই
যদিও হ্দয়পুরের রাস্তা নগরেই শেষ 

তবু সাদা বক ঘন নীল আকাশের দিকে ওড়ে
যদিও রঙের আকাল এখনও দিনের শুরু এবং শেষে
তবু চারিদিকে নীল আয়োজন 


একটি না-কবিতা। - সুদেষ্ণা রায় গোস্বামী

(শেষ লাইন রবি আলোয় আলোকিত)।কিছুটা সত্য ঘটনা ও কিছু টা রূপকের আন্তরিক ফসল।


আজ আবার অভিসারে এসেছি আমি।

আষাঢ়ী শুক্লা তিথির চতুর্দশী চাঁদ, 

সোহাগে লুটোপুটি খায় আকাশকোলে।

মাঝে মাঝে টেনে নেয় মেঘের ওড়না ।

পূবালী হাওয়ার এলোমেলো আদরে ,

চিক চিক করে ওঠে রূপসা নদীর জল।

করুণ প্রেমের একতারার সুরমুর্ছনায়,

বেজে ওঠে মিলনরাগের মেঘমল্লার।

চকিতে মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা ।

এমনই চন্দ্রিল ছিল সেই অভিশপ্ত রাত।

নদীতট ভাসছিল কোজাগরী চতুর্দশীর,

শ্বেত শুভ্র মোহময়ী মায়া জ্যোৎস্নায়।

ইতি উতি ছুটছিল কাদা শামুকের দল।

কিছুটা দূরত্বে তুমি আমি হাঁটছিলাম ,

তীর ধরে পাশাপাশি দিগন্ত অভিমুখে ।

হঠাৎ অতর্কিত ছন্দপতনে দিগভ্রান্ত ,

দিশেহারা হয়ে পড়ল আমার সত্ত্বা।

চোরাবালিতে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুর ,

নীল কালান্তকের দুর্নিবার আকর্ষণ ,

ক্রমশ তিলে তিলে গ্রাস করল তোমায়।

শত চেষ্টা পারেনি তোমাকে আটকাতে।

জানি না কি জাদু ছিল তোমার ওই,

নিষ্ঠুর দ্বিতীয় পুরুষের লোভনীয় ডাকে।

আর ফিরে এলে না তুমি অনিমিখা।

চরম শোকেও নিজেকে অগ্রাহ্য করে,

ফিরিয়ে আনতে গেলাম তোমাকে,

স্রোতস্বিনীর বুক চেরা পঙ্কিল রাস্তায়।

সেই থেকে প্রতি কৌমুদী রাত কাটে,

বিরহের  করুণ অভিসারের খোঁজে ।

হোগলা বনের অভিমানী দীর্ঘ নিঃশ্বাস,

বলে ওঠে ফিস ফিস করে,

চিরসখা হে ছেড়ো না মোরে।

তোমাকেই বলছি সারদামণি মণ্ডল

ছুঁয়ে দেখ.... 

তোমার স্পর্শেই এ হাত ফিরে পাবে সম্বিত

শুধু তোমার ছোঁয়া পেতে ওরা আজও উদ্গ্রীব। 


চেয়ে দেখ... 

এই চোখ আজও শুধু তোমায় খোঁজে

তোমারই বিরহে বোবা কান্নায় বালিশ ভেজে। 


বুঝে দেখ... 

হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আজও হয়নি বন্ধ

তোমার সুরে তাল মিলিয়ে ওরা পেতে চায় ছন্দ। 


খুঁজে দেখ... 

মনের অলিতে গলিতে তোমারই বসবাস

তুমি ছাড়া বিস্বাদ লাগে প্রতিটি অভ্যাস। 


ভেবে দেখ.... 

তোমার আঁকা গণ্ডি আজও আমার সীমানা

ইচ্ছে গুলো বন্দী আজও পায়নি খুঁজে নিশানা। 


মনে রেখ... 

স্পন্দনে তুমি আছো, তুমিই আছো নিশ্বাসে

সম্পর্করা আজও বাঁচে মানুষের বিশ্বাসে।

জ্ঞানের আলোয় ধর্মগ্রন্থ -শিপ্রা কর্মকার

দেবাঞ্জন এখন স্মৃতি শক্তি হারিয়ে শুধু আপন মনে বলে যায় ----জ্ঞানের আলোয় ধর্মের বইয়ের পাতা উল্টে দেখছি । আর ঝরঝর করে চোখের জল পড়ে ! ওর লেখা কাহিনী---জ‍্যোতি আমার জ‍্যোতি

সেদিন পারিনি --পারিনি তোমাকে রক্ষা করতে ! ঐ যে ওরা পিছন থেকে মেরে তোমার মাথা চৌচির করে দিল । তুমি সঙ্গে সঙ্গে  অতর্কিতে পড়ে গেলে ! চোখ দুটো খোলা ! এ যে স্বপ্ন দেখা সেই অপলক দৃষ্টি ,বিস্ময়ে তাকিয়ে আছো ; রক্তে লাল হয়ে গেল তোমার সিঁথির রেখা । একরাশ ঘন কালো চুল দিয়ে বয়ে গেল রক্ত গঙ্গা ! আমি লুকিয়ে ভাঙা বাড়ির পিছন থেকে দেখছি । তোমার নিজের রক্তের সম্পর্কের মানুষ এই নৃশংস হত্যালীলা চালালো শুধু ভিন্ন জাতে বিয়ে করার জন্য ! ওরা আমার নাম ধরে অশ্লীল গালি দিতে লাগল ।  তোমাদের গ্রামে কোনো লোক প্রতিবাদ করতে এলো না । বিশাল লোকের ভীড় ,চীৎকার কোলাহল ! আমার সাহস হোলো না সামনে আসতে । ওরা যে আমাকেও শেষ করে দেবে ! 

                    তুমি তো জানো -----আমি ছাড়া আমার বাবা মায়ের কেউ নেই ! বাবা অন্ধ !  সবকিছু তাকে করে দিতে হয় । গ্রামের সবকিছু বিক্রি করে শহরে চলে আসা ও  ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে  আমার লেখা পড়া । তারপর চাকরি ,তোমার সাথে আলাপ প্রগাঢ় বন্ধুত্ব সর্বশেষ প্রেমের ভালোবাসা ! তারপর তোমার সাহসে আমাদের বিয়ে ! আমি জানতাম বাঙালি অবাঙালি জাতপাতের ব‍্যাপার চলে আসবে । আমি প্রকৃতিগত চুপচাপ শান্ত । ভয় দ্বিধা দ্বন্দ সর্বদা আমার জীবনে গ্রাস করেছে । তাই আমি তোমার মতো প্রাণচঞ্চল ছিলাম না । তুমি আমার জীবনের লাঠি হয়ে গেলে। স্বভাবের পার্থক্য আমাদের দুজনকেই কাছাকাছি নিয়ে এলো ।

                     তুমি আমাকে কয়েক মাসে সব পার্থিব সুখ শান্তি দিলে । বাবা মাকে নিয়ে বেশ সুখ শান্তিতে দিন কাটলো । হঠাৎ সব মেনে নিয়েছি আমরা---- বলে ফোন ,তারপর বাড়িতে আমন্ত্রণ আসার জন্য । তুমি বুঝতে পারোনি ----তোমার আপনজনেরা ঠান্ডা মাথায় আমাদের হত্যা করবে বলে আমন্ত্রণ জানিয়েছে । আমরা কি বোকা !  আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমরা সকলের জন্য শপিং করতে গেলাম । তুমি তোমার দাদা ভাই বাবা কাকার জন্য পছন্দ করে কুর্তা পায়েজামা কিনলে । বাবার জন্য রূপোর পানের বাক্স কিনলে ,তোমার কি আনন্দ চোখে মুখে তারপর ! সব আপনজনকে ছেড়ে চলে এসেছিলে আমার কাছে বিবাহ বন্ধনে ,আমার খুব কষ্ট হতো তোমার জন্য । ঈশ্বরকে ডাকতাম ----সব ঠিক করে দেওয়ার জন্য ।

                    তুমি এতো ভালো মনের মানুষ ----তোমার এই মানসিক টানাপোড়েন আমাকেও খুব কষ্ট দিতো । তাই আমি সবটুকু দিয়ে তোমাকে আগলে রেখেছিলাম । কিন্তু ঐ ফোন কল সব কিছু এলোমেলো করে।দিলো । কি নিখুঁত পরিকল্পনা করে আমাদের শেষ করে দেওয়ার ছক কষেছিল । তুমি আতা গাছ থেকে আতা পারছিলে ----আমি একটু প্রকৃতির ডাকে ভাঙা বাড়ির ভিতরে গিয়েছিলাম । ভিতর থেকে হঠাৎ কোলাহলের আওয়াজ পেলাম -----ওরা বড়ো বড়ো পাথর লাঠি হাতে এগিয়ে আসছে । আমি দূর থেকে দেখলাম  ! সামনে যাওয়ার সাহস ও মনোবল কোনোটাই আমার ছিলো না ‌। তোমার নিজের লোকজন উল্লাসে মত্ত হয়ে মেরে তোমাকে মাটিতে ফেলে দিলো ।

আমি শিউরে উঠলাম -----এইবার আমার পালা ! কে যেন আমাকে হাত টেনে ধরে রেখেছে  ,কিছুতেই তোমার কাছে যেতে পারলাম না । তুমি তাকিয়েছিলে ,হয়তো আমাকে খুঁজেছিলে শেষবারের মতো । আমি যেতে পারি নি ! ওরা তোমার রক্তাক্ত প্রাণহীন দেহ উল্লাস করে পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল । আমার আর খোঁজ নিতে ভুলে গেছে সবাই !

                           পরমেশ্বর আমাকে রক্ষা করলেন ! আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না এই নৃশংসতা ! কিন্তু কিভাবে প্রতিশোধ নেব ?  অতি কষ্টে দ্রুততার সঙ্গে ফিরে এলাম । কাগজে শিরোনাম হলো ঘটনা । মিথ্যা বিবরণ দিয়ে লেখা !  আমি আর জড়াতে চাইলাম না । কিছু দিনের মধ্যে বাবা মা দুজনেই ইহলোক ছেড়ে চলে গেলেন !

                                আমি নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছি না । যদি আমি নিষেধ করতাম ! তাহলে ও সম্পূর্ণ ভুল বুঝতো । আমি চাকরি ছেড়ে এখন বিবাগী হয়ে গেলাম। আজও খুঁজে যাই আমার ধর্মের বইএর লেখা -----কোথায় আছে জাত ধর্ম বর্ণের বিভেদের  কথা ! সেই স্বর্গীয় আলোয় অবিরাম আজও খুঁজে যাই বইয়ের পাতায় মনুষ্যত্বের কথা মানবতার কথা ! 

"প্রিয়ারে আমার কেড়েছিস তোরা ,নিজ আপনার জনেরা !"শুধু বইটি আগলে রাখে আলোলিকার আলোয় জ‍্যোতি যে আছে ওখানে !

                                         --------------

©Shipra.

প্রতীক্ষা - গৌরী দাশগুপ্ত

আগমনীর সুর বেজে উঠেছিল
                      মহালয়ার প্রাতে   ,
ক্ষনপ্রভার মতো মিলিয়ে গেল-
            একটু আলোর ঝলকানিতে!
তোমার প্রতীক্ষায় থাকতে হবে
                          মাস খানেক ধরে ।
ঘাসেরা মখমলের চাদর বিছিয়ে
                           অপেক্ষা  যে করে।-     
বিষাদে ভরা বসুন্ধরা-
              তোমার মঙ্গল ঘট হয়নি ভরা।        
ক্রন্দসী হৃদয় যে ব্যাকুল,
             হতাশায় ঝরে শিউলি  বকুল। 
 মাসখানেক পরে উমা আসবে বাপের ঘরে,
                                 চারটি দিনের তরে
 মা মেনকার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে
           এই বুঝি মেয়ের নৌকা ভীড়লো এসে-
                                      বঙ্গদেশের গাঙে।
দারিদ্র আর মহামারীতে ভরেছে যে দেশ 
                মোদের অপেক্ষার নেই যে  শেষ ,
"হে  দূর্গতিনাশিণী মা,   এই বিপর্যয়ের করবে সমাধান,
                  বদলে দেবে বিধিলিপির অশুভ বিধান ।

শরৎ সাঁঝের তারা - অজয় কুমার দত্ত

সেদিনও আকাশে শরৎ ভোরের সূর্যটা  উঠেছিল

সেদিনও বাগানে শিউলি গাছটা কুঁড়িতে ভরেছিল
আজকের মতো সেদিনও মা দুর্গা এসেছিল ভরা নায়ে
পিছু হাসে যত স্মৃতিকুসুমেরা সুবাসিত করে বায়ে!

লালটিপ ক্যাপ পিস্তল হাতে হাফপ্যান্ট পরা ছেলেটা
সপ্তমী থেকে দৌড়ে ঝাঁপিয়ে কাঁদে বিসর্জনের বেলাটা
তার পুঁচকে বোনটির গায়ে নতুন ফ্রকের সাথে
কপালে ছোট্ট কুমকুম টিপ ভ্যানিটি ব্যাগটি হাতে!!

প্লাস্টিকেরই মনোলোভা রঙা জিভছোলা মতো দেখতে
‘সরি ম্যাডাম’ ছিল তার নাম লাগাতো ছোট্ট মাথাতে
বড় বড় দুই পুঁতি পাওয়া যেত ইলাস্টিকে গাঁথা
খুকুদের প্রিয় ‘লাভ ইন টোকিও’ ঝুঁটিতে থাকতো বাঁধা!

মায়ের শাড়ি ছিল থাকে থাকে সিনেমার নাম মিলিয়ে
‘কাঁচ কাটা হীরে’ ‘বাক্স বদল’ আর ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’
শৌখিন মা সুন্দর মুখে প্রসাধনী ভালবাসতো
‘আফগান স্নো’ প্রমোশন পেয়ে ‘বসন্ত মালতী’  হাসতো!!

নতুন শাড়িতে শিশিটা উলটে লাগাতো কান্তা সেন্টু
আমার জামায় বোনের ফ্রকে আর বাবার গায়েও কিন্তু!
ছিল নাকো নাম বাবার ড্রেসের শুধু ফুলসার্ট ধুতি
প্রিয় ছিল তার ‘পন্ডস পাউডার’~ পাঞ্জাবী অচ্ছুতই!

পূজোর ক’দিনে ‘নাম্বার টেন’-এ আরামের সুখটান
নতুন ব্যাটারী ‘মারফি রেডিও’ আর পূজোর নতুন গান
অমৃতময় হেমন্ত গায়~‘তার আর পর নেই’
‘মধুর মধুর বংশী বাজে’ সন্ধ্যার গলাতেই!!

মান্না কখনো গাইতো বিষাদে~‘আবার হবে তো দেখা’
লতার ‘আকাশ প্রদীপ’ শুনে উদাসী হৃদয় একা
প্রতিমার গানে ঈশ্বরী তান~‘আঁধার আমার ভালো লাগে’
‘দুর নয় বেশি দুর ওই সাজানো সাজানো’~ শ্যামলের অনুরাগে!

সুখেদুখে ভরা দিনগুলো ছিল হাসি আনন্দে ঘেরা
আকাশের ডাকে মা হঠাৎ হলো শরতের সাঁঝতারা
আজও সায়াহ্নে ঘোর লাগা মনে শূন্যে তাকাই একা
স্থির আলো জ্বেলে সাঁঝতারা বলে~‘কাঁদছিস কেন বোকা’!!

খুশির সরোদে অতীত বাজায় লুকনো ব্যথার মালকোষ
কষ্ট যে পাই শুনতে না চাই তবু ঝরাবেই আঁখিরস!
এক মা হাসে প্রতিবার আসে আগমনী গান বাজিয়ে
আর একটি মা শারদ আকাশে সাঁঝতারা হয়ে তাকিয়ে!!

শরৎ রানী - পারমিতা রাহা হালদার (বিজয়া)

এই তো সেদিন বর্ষা গেল শরৎ এলো দ্বারে,

এরই মধ্যে কাশ ফুলেরা দুলছে নদীর ধারে!  


শুভ্রাকাশে স্নিগ্ধ সকাল শিউলি ফুলের গন্ধ, 

শরৎরাণী মিষ্টি সাজে, উল্লাসে মাতে ছন্দ।


ভেবেছিলাম কাশের সাথে রোদ মাখব পিঠে,

সোনালি আলোয় ভেজাবো শরীর,বইছে হাওয়া মিঠে।


শিশির কণা ভোরের হাওয়া ছিন্ন মেঘের মেলায়,

হঠাৎ করেই কাশ দুলছে মাটির বুকে লুটায়।


নীল আকাশে কাজলা মেঘ ছুটতে ছিল ব্যস্ত,

তখন আমার শরৎরাণী ভরালো ভুবন গাত্র। 


পুকুর পাড়ে মাঠের পরে পথের ওই ধার,

বাঁশবনেতেও কাশ ফুটেছে দারুন লাগছে ঝাড়।


মেঘ মুখরিত পাখির কুজন নীলাকাশে দোলে,

হঠাৎ করে বর্ষা এলে ময়ূরপঙ্খী পাখা মেলে ।


শরৎরাণী সেজেছে যেন নববধূ এক কন্যে,

শুভ্রকাশ গুচ্ছ চূড়া কালো খোঁপার জন্যে।


শরৎরাণী রূপসী সাজে রূপকথার কাব্য গাঁথে,

প্রেমিক পুরুষ চোখ জুড়িয়ে ভালোবাসার স্বপ্নে মাতে। 


মেঘবালিকা নীলাকাশে কবিতার স্বপ্ন বোনে,

শরৎরাণী কাশ বনে শ্বেত পরীর গল্প শোনে।

আবির খেলা - শৌভিক গাঙ্গুলী

চল, একটু আবির খেলা যাক।


মরতে মরতে 

চিতার আগুন গা-সওয়া হয়ে গেছে ।

চল এবার তবে ফিরে যাই, নিষিদ্ধ খামার জীবনে।


বোমারু বিমান আর মিলিটারি সাইরেন, 

জানিয়ে যায়, গভীর মধ্য রাত, দুধারে গভীর খাদ।


দুহাত তুলে এসে দাঁড়াও, সংসদ ভবনের সামনে, সমাজের ফুসফুস বিষ মেশানো পায়েস আর 

কর্কট সংক্রমণে।


সেচ্ছা-নির্বাসিত কৃষ্ণ,

সাধিকা মীরা আর প্রেয়সী রাধার জীবনে।


অন্তিম ইশারায়, তুমি আর অন্তত তিনজন, একসাথে নদীতে ধুয়ে এসো সবুজ চরণ,

ইহকাল-পরকাল, গিলতে হবে সভ্যতার রাহুগ্রাস।


দেওয়াল জুড়ে পাহারা দিও, বাড়িয়ে দুহাত।

আগুন কি জমে, সূর্যাস্তের পরে, সন্ধ্যা যখন নামে।

দৃশ্য-অদৃশ্য কে পুড়ল, কাকে পোড়ালো কে জানে।

ৠগ্বেদে সৌর সবিতা, তার রথ হিরণ্ময়, 

পৃথিবীর চাঁদ নব-বন্যায়, আনন্দ-শিলা অরুন্ময়।


ফকিরি সুর সর্বনাশা, অন্ধমিলন রক্তময়।

আবির খেলা গলির মুখে, ফাগুনরূপা চিতা জ্বলে।


এখন দেখাও একটা ম্যাজিক, বাঁধন ছিঁড়ে রাতের চিতা জ্বালাবে, মেষপালক আর ভিনদেশি পথিক।


চল, একটু আবির খেলা যাক।

মহামায়া - মৌলি বণিক

(যে নবম মৃত্তিকার অনুপস্থিতিতে মহামায়ার নির্মাণ অসম্পূর্ণ, তারাও মহামায়ার একাংশ, নারীশক্তি বা মহামায়ার এক রূপ)


রাতের মহামায়া তখন দারুণ ক্ষিপ্র তৎপর

লক্ষ্য পূরণ পালার নায়িকা- চলমান সফর।

নির্ঘুম রাতের উচাটনী বেলা হয়েছে বায়না

পৌঁছাতে হবে ভুল স্বর্গে দেরি কেউ সয় না।


মদীর হাস্যে লাস্যে ঝলসায় রঙীন মধ্যরাত-

শিকড় ধরে উপড়ে টানে আশ্চর্য অভিঘাত!

ভিতর অলিন্দে নীরবে ফোটে রক্তকরবী কৃষ্ণচূড়া

নিখুঁত বিভঙ্গে তবুও ঢালে যৌবন ও সফেন সুরা।


জোছনা হেনে চাঁদ জ্বলে যায় রূপালী রূপ ঢেলে

শিশির জমে ঘাসের বুকে অতীত কানামাছি খেলে;

মন ভেসে যায় চিলের ডানায়- হিমেল হাওয়ায় দোল

নীলাভ দুনিয়া ধোঁয়া উৎসব বলে 'হল্লা বোল'।


অগ্নিজ্বালা রৌদ্রমুখী কালরাত্রিতপস্বিনী

সব লেনদেন শেষে সেই সত্যানন্দস্বরূপিনী।

বাতাস জুড়ে শিউলি ঘ্রাণ, রাত পোহালে বোধন

মহামায়া একই, ভিন্ন প্রকাশে অশুভ করে নিধন।


(কলমে ও স্বত্বাধিকারে, মৌলি বণিক)

দুর্গার চিঠি - দলছুট পাখি

কেমন আছো বাবা? মায়ের শরীরটা আগের থেকে ভালো আছে তো?

বছর ঘুরে ঘরের উমা আবার বাপের বাড়ি চললো।

কয়েক বছর হয়ে গেল আমার বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ।

আর এজন্মে কখনো যাওয়া হবে কিনা জানিনা।


শ্বশুর বাড়িতে আমি খুব ভালোই ছিলাম ।

এত ভালো ছিলাম তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

তোমার জমিতে এবার কেমন চাষ হলো? দাদারা তোমাকে এখন মাঠের কাজে সাহায্য করে তো?

বড়দা চিরকাল সাহেবি মানসিকতার মানুষ,

ওকে কখনো জোর কোরো না মাঠে যাবার জন্য।


জানি এই চিঠি পড়ে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে।

আমি সব বুঝি বাবা।

সেবার ছোড়দার কলেজে ভর্তির টাকা আর বন্ধকি জমিটা না ছাড়াতে পারলে সত্যি তোমাদের সেদিন সবাইকে রাস্তায় দাঁড়াতে হতো।


অনেক বড় মনের মানুষ আমার শ্বশুরমশাই। 

সেদিন তোমাকে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়ে এলেন আমায় নিজের বড় ছেলের বউ করে।

পনেরো বছর বয়সে কিই বা বুঝতাম বিয়ের!

বিয়ের সময় স্বামীর মুখ মাত্র একবার দেখেছিলাম ঘোমটার ফাঁক দিয়ে।


বাসর রাতে...

না না বাবা তুমি ভয় পেয় না!

তোমার দুর্গা খুব ভালো ছিল সবার আদরে ছিল।

আমার শ্বশুর, স্বামী, তিন দেওর ওরা পাঁচজনেই খুব আদরে রেখেছিল আমায়।

পাঁচ লাখ টাকাটা কম নয়!

পাঁচ জনকে খুশি তো আমাকেই রাখতেই হতো।


প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হতো!

প্রায় সারা রাত জাগার পর সকালে উঠে বাড়ির সমস্ত কাজ করার সময়ও উঠোনের এদিক ওদিক পরে থাকতো রক্তের দাগ।

এখন আর সেসব কিছু হয় না।


ওরা আমাকে এখন একটা ভালো জায়গায় নিয়ে এসেছে।

দরজার আড়াল থেকে দেখেছিলাম দুটো লোক আমার শ্বশুরমশাইকে দশ লাখ টাকা দিল।

পাঁচ লাখের বিনিময়ে দশ লাখ কম কি বলো?

খুব খুশি দেখাচ্ছিল আমার স্বামী দেওরদের।


দশ লাখের বিনিময়ে তোমার দুর্গা এখন দশভূজা।

কিন্তু দশ ঘন্টা আমার হাতদুটো কোনো কাজ করে না জানো!

শুধু নিথর হয়ে পরে থাকে শরীরটা।

বাকি সময়টা নিজের হাতেই নিজেকে সাজাই বোধন থেকে বিসর্জনের জন্য।

ধূপ-ধুনো জ্বেলে, রঙিন আলোর সামনে বসি অঞ্জলি গ্রহণের জন্য।

প্রণামীও পাই ভালোই।


এবছর তোমার জন্য পাঞ্জাবি, মায়ের শাড়ি, দুই দাদার জন্য দুটো দামি হাতঘড়ি কিনেছি।

ভেবেছিলাম বাপের বাড়ি যাবে দুর্গা!

কিন্তু জানতো বাবা-

পুজোর এই পাঁচদিন এই জ্যান্ত দুর্গাকে ছোঁয়ার জন্য অনেক লোকের ভিড় হয়।

তাদের নিরাশ করি কি করে বলো?

দশ লাখের বিনিময়ে এই দুর্গাকে যারা কিনেছে তারা নিজের লোকসান কিছুতেই মানতে চায় না।


আমাদের মাটির বাড়িটা ভেঙে নিশ্চয়ই এতদিনে দালান তুলেছো?

পুজোর আগে মা যখন আমাদের মাটির দেওয়াল নতুন মাটি দিয়ে লেপত-

সেই গন্ধটা আমি ভীষণ ভালো বাসতাম। দেওয়ালে নাক লাগিয়ে জোরে জোরে গন্ধ শুঁকতাম।

এর জন্য কত বকা খেয়েছি মায়ের কাছে।


এখন আর সোঁদা মাটির গন্ধ আমার নাক পর্যন্ত পৌঁছায় না। 

তবে আমার ঘরের ধুলো নিয়ে যায় কত মানুষ।

এই ধুলো,মাটি ছাড়া নাকি প্রতিমা তৈরি হয় না!

সারা দুনিয়াতে এত মাটি থাকতে কিনা আমার ঘরের মাটিই ওদের প্রয়োজন।

খুব হাসি পায়।

মনে হয় আমি এত দিনে সত্যিকারের দশভূজা হতে পেরেছি।

তাই না বাবা?


দশ লাখের বিনিময়ে দশভূজা...

তোমার দুর্গা দশভূজা...


এবার তোমায় কথা দিলাম-

বিসর্জনের পর বাপের বাড়ি যাবো।


নিতে এসো গঙ্গার ঘাটে-

রক্তমাংসের শরীরের শুদ্ধতা নষ্ট হয় কিন্তু গঙ্গা মাটি মিশে থাকা ছাই তো শুদ্ধ...

তাই না?


বিসর্জনের অপেক্ষায় রইলাম-

এবার ঠিক বাপের বাড়ি যাবো।


আমায় নিতে এসো কিন্তু...



©দলছুট পাখি

@#champa sarder

বিদ্যারূপেণ - কলমে_কুহেলী_মুখার্জী

 #বিষয়_শারদোৎসব_ও_গ্রামবাংলা

#বিভাগ_গল্প

#


সময়টা তখন পরবর্তী বৈদিক যুগের, মেয়েদের অবস্থান সমাজে কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হয়েছিল---এই গল্পটা সেই সময়কার।।


হয়তো কিছুটা সত্যি আর কিছুটা কল্পনার আশ্রয় মেশানো এই গাঁথায় লুকিয়ে রয়েছে এক নির্মম সত্য ; যা প্রমান দেয় যুগে যুগে মেয়েদের প্রতি হওয়া নির্মম অত্যাচারের। দিন পাল্টায়,সময় পাল্টায়, আকাশে তবুও চাঁদ-সূর্য ওঠে, মানুষের মানসিকতা কিন্তু বদলায় না, সময়ের প্রভাবে তার মুখে ওঠে নতুন মুখোশের প্রলেপ কিন্তু অন্তরের কুৎসিত মনোভাব রয়েই যায়।।


প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন নদীতীরে এক এক করে গড়ে উঠেছিল  সুপ্রাচীন জনপদ,আমার গল্পের  শুরু এখান থেকেই।গড়ে উঠেছিল সময়োচিত সভ্যতা, বর্ণ-কার্যভেদে চতুরাশ্রম প্রথা প্রচলিত ছিল। সে যুগ ছিল প্রাক-বৈদিক যুগ, সমাজে মেয়েরা পর্দানসিন ছিলোনা, সংসারের প্রধানা ছিলেন গৃহকর্ত্রী, পুরুষ-নারী ভেদভেদে নয়, সমাজের চাকা চলতো নারী-পুরুষের সমানাধিকারে।

সংসার কিংবা সমরে, বিদ্যা কিংবা রাজসিংহাসনে নারীরা পুরুষের সমকক্ষ ছিলেন, বাধ সাধলো পুরুষতন্ত্র, মেনে নিতে পারলো না নারীর সমানাধিকার।মেয়েরা তখন রীতিমতন পুরুষদের সমকক্ষ হয়ে বেদ রচনা করছে, যজ্ঞে অংশগ্রহণ করছে এমনকি বেদশিক্ষা দান করছে ছাত্রদের।।বেদ পরমব্রহ্ম,স্বয়ং আদিপিতা--জগৎ সৃষ্টিকারীর মুখনিঃসৃত বাণী--এই বেদে কখনোই নারীদের আধিপত্য স্থাপন করতে দেওয়া চলবেনা।পুরুষসমাজ বিরোধিতা শুরু করলো, মেয়েদের বিদ্যাশিক্ষা,অস্ত্রশিক্ষা--বিভিন্ন সামাজিক বিধিনিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ হলো, মেয়েদের স্বাধীনতা খর্ব হলো।।

যুগে যুগে যখনই কোনো ধর্মসংকট পৃথিবীকে ছেয়ে ফেলেছে, তখন তাকে মুক্ত করতে জন্ম নিয়েছেন হাজার হাজার দুর্গা--বিভিন্ন নামে,বিভিন্ন রূপে।

সরস্বতী নদীতীরে সমৃদ্ধ জনপদে ছিল ঋষি অমবৃন্যাখ্য এর আশ্রম, বেদজ্ঞানে ঋদ্ধ সেই ঋষির আপন বলতে ছিল মাতৃহারা একমাত্র কন্যা অমব্রিনী। বেদজ্ঞানে সিদ্ধাহস্তা সেই ঋষিকন্যার সার্বিক পরিচয় ছিল বাক নামে। 

সমাজ যখন ধীরে ধীরে মেয়েদের লেখাপড়ার পাশাপাশি সামাজিক স্বাধীনতাটুকুও হরণ করেছে, এমনকি বেদের ওপর থেকে মেয়েদের অধিকার কেড়ে নিতে উদ্যত হয়েছে--সে সময় বাক সরব হয়েছেন নারী স্বাধীনতা নিয়ে, বিভিন্ন যুগদ্রষ্টা ঋষিদের সাথে তর্কের আসরে অংশ নিয়েছেন নারীদের পড়াশোনার স্বার্থে।

পরবর্তী বৈদিক যুগ , এক অস্থির সময়ের ইতিকথা বলে। বাক নিজের পিতার আশ্রমে নারীদের জন্য পুনরায় বেদশিক্ষার আসর চালু করেন, যে আসর একদিন সামাজিক পুরুষতন্ত্রের নিয়মে বন্ধ করা হয়েছিল। অনেক সামাজিক চোখরাঙানি, বিধিনিষেধের পরেও থামানো যায়নি  ঋষিকন্যা বাককে।  

কোনো এক অকাল মুহূর্তে আশ্রমে সেদিন কেউ উপস্থিত ছিলেন না, সামাজিক নিয়মের ধ্বজাধারী ব্যক্তিত্বরা পুড়িয়ে দেন আশ্রমটি, সেই সাথে জীবন্ত পুড়ে যায় ঋষিকন্যা বাক আর তার সারাজীবনের পরিশ্রমের ফসল তার লিখিত বেদসুক্তগুলি। সমাজে রটিয়ে দেওয়া হয়, সৃষ্টিকর্তার রোষে পুড়ে গেছে আশ্রমটি, কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। আশ্রমটি আগুনের লেলিহান গ্রাসে পুড়ে যাওয়ার পর এক বিধ্বংসী বন্যায় ভেসে যায় আশ্রম ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল। বলা হয় সরস্বতী নদীর অন্যরূপ ছিলেন ঋষিকন্যা বাক, প্রকৃতির অন্যতম রূপ তিনি।বলা হয় ,এই বন্যার পর দিক পরিবর্তন হয় সরস্বতী নদীর। এর ফলে , ধীরে ধীরে নাব্যতা-নিজস্ব গতিময়তা হারায় সরস্বতী নদী, একসময় লুপ্ত হয় সে।

বাক রয়ে যান অন্তরালে, সরস্বতী নামের আড়ালে হারিয়ে যায় সত্যতা।।

কথাই শুধু - আর্যতীর্থ

তোমার দুর্গা আমার দুর্গা অনেক তফাত জানি

প্রতি পুজোয় ফিরে ফিরে আসে সে হয়রানি।

তোমায় বলি, আমায় বলি এবং আপনাকেও,

কবিতা যে ছোঁয় না মোটে বলছি আমি তাকেও

আগের বছর এই বছরের পুজো দুটোর মাঝে

একটি বছর কেটে গেছে রঙবেরঙের কাজে

এর মধ্যে কয়টা মিনিট অন্য দুর্গা দাগ কেটেছে?

ওদের তো সেই ভেজা শ্রাবণ, শীতে কেঁপে মাঘ কেটেছে

তোমার ঘরে কাজ করে যে সে দুর্গাটার খোঁজ করো?

ক্যানিং লোকাল লেট করলে লক্ষ কথায় দোষ ধরো।

যেই কার্তিক মোড়ের মাথায় নোংরা হাতে কাঁচ মোছে

কেউ জানেকি বোশেখ রোদে কেমন করে বাঁচছে সে?

গনশাকে তো প্রায়ই দেখো ভিক্ষা করে ফুটপাতে,

নতুন কোনো জামা কিনে কেউ দিয়েছো তার হাতে?

সরস্বতী ভাত সামলিয়ে বোনকে কোলে ঘুরে বেড়ায়

উকুনমাথা অলক্ষ্মীটা তোমার পাড়ায় কাগজ কুড়ায়,

সারাবছর এদের জীবন একটু হলেও পাল্টেছো কি?

ওসব করার থেকে সহজ শব্দে শব্দে ঠোকাঠুকি।

শুধুই কি আর রাষ্ট্রের দোষ? যতই কেন যুক্তি শানাই,

মুখের কথায় পিঠ বাঁচিয়ে, অন্য দুর্গা আমরা বানাই।



এলোমেলো : রাজ দত্তগুপ্ত

ভিজছে মন, আকাশ-ঝড়ের সাথে

বোঝে কি কেউ, ভীষণ এলোমেলো 

লেখার পাতা, মনও নেই তো তাতে 

লেখনী ঘরে জমে যাচ্ছে যত ধুলো


খুঁজছি শুধু জীবনবোধের শেষ ধাপ 

এগিয়ে যেতে জানিনা পারবো কিনা 

ঘিরছে যে বিভীষিকার অহরহ উত্তাপ 

বড়ই বেশি ঋণ, বড় হয়ে গেল দেনা 


অকারণ হবে, তবু হা হুতাশেই মরি 

আশার পাহাড়ে উঠেও পড়ে যাই 

জিনের দৈত্য, পায়ে পড়েছে বেড়ি 

ঋণের বোঝায় সত্যিই হারাতে চাই


কে নেবে ভার, কে বা বইবে ঝুলি

বলছি যা আজ, জানবে একদিনে

এলোমেলো গো, মাথার ঘিলুগুলি 

চরকা কাটে বুড়ি, বড়ই অভিমানে 


শেষ কথাটা এখনো হলো না বলা

চিন্তার নদী কিভাবে পেরবো কবে 

ডুবেও ভাসছি,ঐ ভাটার ছলাকলা

এলোমেলো.....সে কবে শেষ হবে

মাগো আমার মা - কবি-স্বর্ণলতা মণ্ডল

 

🌾🌾🌾🌾🌾🌾

মাগো আমার মা,

এমন সময় এলে তুমি

ঘর ভরা কান্না।

ঝড় উঠেছিল,চাল উড়েছিল

প্লাস্টিকে সব ঢাকা

এর পরেও পেট বেড়েছে

চালের হাঁড়ি ফাঁকা।


মাগো আমার মা,

এমন সময় এলে তুমি

ঘর ভর্তি কান্না।

কতদিন হোল কর্তা ঘরে

কাজের খবর নেই।

রেশনের চাল হাঁড়িতে চড়ে 

বেঁচে আছি শুধু এই।

বাজারের দর কি ভয়ঙ্কর

হাত দিলে হাত পোড়ে

চালে আর গমে 

আছি কোন রকমে

একে কি বাঁচা বলে?

যাদের ঘরে অঢেল আয়োজন

ক্ষুধা বড়ো শৌখিন

দু'বেলা খাবার জোটে না যাদের

শরীর শুকিয়ে ক্ষীণ।


মাগো আমার মা,

এমন সময় এলে তুমি

ঘর ভরা কান্না।

শারদীয়ার শুভেচ্ছাসহ - মানস মুখোপাধ্যায়

শরতের আকাশে আজ

হাসি-কান্নার রোল

রোদ বৃষ্টি মাখা সকালে

কে বাধায় গন্ডগোল ।

করোনা ! ভাইরাস ?

রক্তচক্ষু

করি না ভয় ।

হা হা হা

বেপরোয়া.....

আকাশে বাতাসে আগমনী সুর

কাশ ফুলে ভরা

মাঠ-ঘাট

পুজোর গন্ধে ভরপুর ।

কে শুনবে মানা

না না না ....

মানছি না  

বাধা-নিষেধ ।

আসুক বা না আসুক

কোন প্রতিষেধক ।

পুজো এবার হচ্ছেই

মুখে মাস্ক হাতে স্যানিটাইজার

প্যান্ডেল প্যান্ডেল এ

হাজিরা থাকছেই।

আসছে মা.....

দামাল ছেলেরা ব্যস্ত

আয়োজন সামান্য হলেও

জাঁক জমক মস্ত ।

সরকারি দানে

মদতপুষ্ট

কেষ্টা বিষ্টু

হৃষ্টপুষ্ট

ক্লাব সংগঠন ।

শারদীয়ার শুভেচ্ছাসহ

রইল সবার নিমন্ত্রণ ।

ব্রাত‍্য কথা - সত‍্য রঞ্জন বণিক

মা আসছে শরৎকালে শহরে ও গ্রামে,

উদ্যোক্তারা ব্যস্ত ভারী নব নব থীমে।

ষষ্ঠীতে হবে মায়ের পূজার বোধন,

সেলিব্রেটি করবে পূজার উদ্বোধন।


কাঁচের মন্ডপ, গীর্জার আদলে গড়া,

শিল্পের নিদর্শন তা কারুকার্যে ভরা।

অভিনত্বের ছোঁওয়ায় দেবী প্রতিমা,

শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিযোগিতায় সেরা প্রথমা।


ঝলমলে নিয়নে করবে মন জয়,

সালঙ্কারা দেবী কিন্তু ভক্তি অবক্ষয়।

মাটিগড়া দুর্গায় বিপুল অর্থ নষ্ট,

জীবন্ত দুর্গা শূন‍্য জঠরে করে কষ্ট।


এই পূজা হোক অতি সাদামাটা ঢঙে,

ওরাও মাতুক না উৎসবের রঙে।

       

        -------

রাতের নীর হয়ে শিশির - অমিতাভ মীর

নীল আকাশে বেড়ায় ভেসে সাদা মেঘের ভেলা,

সফেদ পেঁজা তুলোর মত চোখ জুড়োনো খেলা।

শরৎ শোভা মনোহারিণী শিউলি ঝরা ভোর,

রাতের নীর হয়ে শিশির বেঁধেছে ঘাসে ডোর।


শারদ দিনে কাশের বনে বায়ু দোলায় দোলে,

কাশের সাদা ফুলের শোভা নয়ন ভরে তোলে।

তুষার সাদা দোলনচাঁপা কুন্দকলি হাসে,

সুরভি সুখে বনের অলি ফুলের কাছে আসে।


শিউলি পাতা পথ গালিচা পদ পরশ চায়,

অনেক দূরে মহুল বনে বেহাগ শোনা যায়।

হৃদ কমলে মদির ছোঁয়া আবেশ ভরা মন,

আগমনীর ছন্দ সুরে মেতেছে মধু বন। 


এমন মধু শারদ ক্ষণে খুঁজছে কাকে মন,

কার হাতের সোহাগ পেতে কাঁদছে অনুক্ষণ। 

কোন কাননে পেতে আসন পুজায় আছো তুমি,

তোমার খোঁজে কাঁপিয়ে তুলি আকাশ, জল, ভূমি!


এক শরতে বুকেই ছিলে এই শারদে নেই,

তোমার কথা ভাবতে বসে হারিয়ে ফেলি খেই।

কোন কাননে বেঁধেছো বাসা হয়েছো কার সাথী, 

আর কি পাবো তোমার দেখা নামছে চোখে রাতি!


তোমার দেখা এই জনমে আবার যদি পাই,

থাকবে শুধু আমার হয়ে এটাই শুধু চাই।

কাশের বনে হারিয়ে যাবো হবো মেঘের ভেলা,

শিউলি মালা গলায় পরে শিশিরে ভিজে খেলা |

নীরব পঙক্তি - নিমাই ন্যায়বান

পূর্ণতার কাছে আমি পরিত্যক্ত অনন্তকাল ধরে...

উত্থান-পতনের শব্দ শুনে বাঁধ ভাঙা চিৎকারে 

আমার আকাশ এলোমেলো।

জীবন- মরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে-

কতকাল এই শূন্যতার দিকে চেয়ে থাকা যায়?


নৈশব্দের দুঃখ অবসাদে-

খন্ড খন্ড মানচিত্রের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে 

কবিতার মায়াবী আঁচল। 

ভয়ানক অগ্নিগর্ভে অবিন্যস্ত যতিচিহ্ন নিয়ে সকাল সন্ধ্যায় বসে আছি ভাঙা চেয়ারে। 


কোথাও শূন্য মাঠ;

কোথাও শুনশান বারান্দা;

কোথাও ছিটেফোঁটা মেঘ!

কোথাও বা ঝলসে যাওয়া ঘাসের শরীরে 

দুর্যোগ আর মহামারীর আস্তরণ।



আশা-আকাঙ্ক্ষার স্পর্শে নিমজ্জিত 

বিপন্ন পৃষ্ঠাদের করুণ আর্তনাদ-

'আমাকে বাঁচাও! আমাকে বাঁচতে দাও!

শান্তিনিকেতনের দীর্ঘ নিশ্বাসে কলমদানিটাও 

আজ বড্ড অসহায়।


মরচে পড়া রেলপথে জীবনের ব্যাকরণ 

উপলব্ধির অন্তরায়।

অস্পৃশ্যতার আঁধারে অশ্রুভেজা মাটির কষ্ট অনুভবেও অক্ষম।

নির্ঘাত বিপর্যয়ের মাঝে আমিও একটুকরো বিরামহীন নীরব পঙক্তি।   


               -----------*********-----------

বিনতি - শ্রী ভট্টাচার্য্য

কাশের বন

আদুরে নীল নভ

শিউলি বেলা,


শরৎ জুড়ে

বাউল মননের

খুশির মেলা।


মা আসবেন

এই খুশি ধরে না

গিরিরাজের


অনন্দপুরী

হিমালয়ের ঘরে

ধুম সাজের।


উমা এলেই

তাকে বলেই দেব

অসুর ওরা


নারীর মান

নিলাজভাবে লুটে

আনন্দে যারা


নিধন করো

তুমি ওদের মাগো

মিনতি করি।


মেয়ে-মানুষ

মায়েরই রূপ যে

অনিন্দ্য পরী।


কান্না মোছাও

দুর্গতি নাশো তুমি

শোন প্রার্থনা


মেয়ের দেহে

নজর যারা দেয়,

ক্ষমা করো না।


____×××____

দুগ্গা - নন্দিতা মিশ্র

সরকার যদিও ঘোষণা করে দিয়েছে এ বছর নির্দিষ্ট নিয়ম বিধি মেনে পুজো হবে।  তবু প্রতিমার বায়না দিতে মানুষের সমাগম নেই। রথের পর থেকেই ভীড় লাগে মানুষের। কত পুজো কমিটিকে ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য হন কুমোরটুলির বিশিষ্ট মৃৎশিল্পী বিভাস পাল। কিন্তু এবারে কেউ আসছেই না।

 কুমোরটুলির এক পাশে ডাই করে রাখা মাটিগুলো যেন তার হাতের পরশ না পেয়ে ব্যথাতুর। তার মাঝে এবারে যেন বৃষ্টি, বৃষ্টি আর বৃষ্টি। নিম্নচাপের পর নিম্নচাপ। বারিধারার নিরবচ্ছিন্ন বর্ষন প্রতিমার জন্য রাখা মাটিগুলোকে কাঁদিয়ে ছাড়ছে বারবার।

 বিভাস পাল তথা কুমোরটুলির মানুষদের

বারোমাসের খরচ এই একমাসেই তুলতে হয়। কি হবে, না-হবে কে জানে এবার, একে এমন বিপর্যয় তাতে, বাজার যা' তুঙ্গে তাতে এ'বছর বুঝি আর প্রতিমা গড়া হলো না। 


 মনের মধ্যে একটা বিকার জেগে ওঠে বিভাসের। মাঝরাতে ঘর থেকে এসে বসে গঙ্গারধারে। অতীত ও ভবিষ্যতের মেলবন্ধন রচনা করতে করতে কখন ঘাটের সিঁড়িতে পাণ্ডাদের চালাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে, বুঝতেই 

পারেনি।

ভোরের শীতল হাওয়ার সাথে, পায়ে একটা নরম হাতের ছোঁয়া পেয়ে ঘুম ভাঙ্গল।

কী কাণ্ড গঙ্গা তো ফুঁসছে! সারা কোলকাতা বুঝি ভাসিয়ে দেবে। ভাগ্যিস... ছোট্ট মেয়েটা ডেকে দিয়েছিল।

 তাকিয়ে বলল বিভাস, 'কে তুমি?'

 'আমি! আমি ঐ যে ঐ বাড়ির মেয়ে গো, নাম দুগ্গা!'

 'এত সকালে তুমি কেন একা নদীর ধারে এসেছো? যদি কোনো বিপদ হয়, চলো আমি ছেড়ে দিয়ে আসি বাড়িতে।'

 'আমাকে তো সেই কবেই ছেড়ে দিয়েছে সবাই। তুমি আমার কথা ভেবো না। আজ ঝড় আসবে গো! সবাই বলছে সে ঝড়ের নাম 'গতি'... তুমিও নইলে ডুবে যাবে। তুমি বাড়ি যাও, তোমার প্রতিমাগুলোকে ঢাকতে হবে তো! দেখছ না কালো মেঘ...'

 অবাক হয়ে আকাশে তাকিয়ে দেখল প্রচণ্ড ঝড় আসবে বলে সেজে উঠেছে প্রকৃতি, গঙ্গার জলে নিম্নচাপের রেশ। ছলাৎ ছলাৎ করে ঘাটে এসে আছড়ে পড়ছে। সেদিকে তাকিয়েই নিজের মনেই বলে উঠল, 'এবারে যে একটাও বায়না পাইনি রে মা! কোন প্রতিমা ঢাকব আর! ঘন বিপর্যয় নেমে এসেছে এ দুনিয়ায়।'

 'এত কথা আমি কইতে পারব না বাপু, তুমি বাড়ি যাও, আমিও বাড়ি যাই...' 

 দুগ্গার কথায় বিভাস উঠে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। কী মনে হলো ঘুরে তাকিয়ে দেখল, দুগ্গা সিঁড়ি দিয়ে জলে নেমে যাচ্ছে। চিৎকার করে উঠল, 'ডুবে যাবি, ওদিকে যাস না!'

 ওর চিৎকারে আশপাশের বাড়ি ঘর থেকে লোকেরা এসে জড়ো হয়েছে। এ বছর সবারই একই দশা, সেভাবে কেউ কোনো বায়না পায়নি। শ্রাবণ শেষ প্রায়। 

 পাশের বাড়ির হরি খুড়ো বলল, 'কাকে ডেকে চিৎকার করছিস বিভাস! কেউ নেই তো!'

 বিভাস আঙ্গুল তুলে বলল, 'দুগ্গা জলে নেমে যাচ্ছে, ওই দেখো। ওকে ধরো, তোমরা সবাই ধরো! ও ডুবে যাবে...'

 ততক্ষণে নিমাই পাল এসে হাজির। তাকে জোরে ঝাঁকিয়ে বলল, 'কী বলছ তুমি? কোন দুগ্গা?'

 'ওই যে গো! মিষ্টি হাসছে আর নেমে যাচ্ছে, ধরো... 'ওই তো আমাকে বলল, 'ঝড় আসছে ঘরে যাও, তুমিও ডুবে যাবে... প্রতিমা সামলাও...'


 ততক্ষণে কালো মেঘ ও ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে গঙ্গার তীরে টেকা যাচ্ছে না। দুগ্গাকে জলে নামতে না দেবার জন্য দৌড়ে গঙ্গার দিকে নামতে যাচ্ছে, সবাই চেপে ধরেছে তাকে। বিভাসের স্ত্রী মালাও ছুটে এসে। বৃষ্টিও এল মুষলধারে। এক কথায় টানতে টানতে তাকে নিয়ে এসে বসানো হলো সামনের চাতালে। 

 বিভাস সমানে বলে চলছে, 'দুগ্গাটা জলে ভেসে গেল। ওকে বাড়িতে আনো।'


 নিমাই এর চোখে জল। অনেকটা সময় চুপ করে থেকে বলল, 'দুগ্গা বহু বছর আগেই ভেসে গিয়েছে বিভাস। তখনো তোমরা এখানে আসোনি। এমনই শ্রাবণ শেষে আমি অন্ততঃ পাঁচটা প্রতিমা গড়ার বায়না পেয়েছিলাম। আমার বাড়িটা তো গঙ্গার ঠিক পারেই, আমি প্রতিমা গড়ছিলাম এক মনে। হঠাতই নিম্নচাপের ঘোষণা হলো। পাঁচটা প্রতিমারই শরীরের কাজ আমার শেষ। হঠাতই মুষলধারে বৃষ্টি। আমার ছোট্ট মেয়ে দুগ্গা ঘরের চাতালে বসে দেখছিল আমার কাজ। বলল, 'বাবা, দ্যাখো নদীর জল কেমন সিঁড়িতে ছলাৎ ছলাৎ করে পড়ছে। আমি হাত দিয়ে দেখব।' মেয়েকে নিষেধ করলাম, 'না, এখন মা গঙ্গা ফুঁসছে, এখন গঙ্গার কাছে যেতে হয়না।' দুগ্গা চুপ করে দেখতে লাগল, গঙ্গার জলকেলি।

আমি আর গঙ্গার মা প্রতিমা ঢাকতে ব্যস্ত। কখন যে দুগ্গা গুটি গুটি পায়ে নেমে গেছে গঙ্গার সিঁড়িতে, প্রতিমা ঢাকতে গিয়ে দেখতেও পাইনি আমরা। যখন দেখলাম তখন দুগ্গা গঙ্গার জলে শেষ পাটা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিধ্বংসী গঙ্গা সাথে সাথেই টুপ করে কোলে তুলে নিল আমার দুগ্গাকে, আমাদের দুগ্গাকে। মৃন্ময়ীকে সামলাতে গিয়ে চিন্ময়ী মায়ের আমার শ্রাবণ শেষেই বিসর্জন হয়ে গেল। এমনই এক ঝড়ে আমাদের ছেড়ে গিয়েছিল সে, হয়তো তোমাকে বাঁচাতেই ফিরে এসেছিল। তাই শুধু তুমিই দেখেছ, আমাদের একবার দেখাও দেয়না হতভাগী! ওকে যে বাঁচানোর চেষ্টা করিনি আমরা, আমরা বায়না করা প্রতিমাই বাঁচিয়ে চলেছিলাম...' বলেই হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

 বাকরুদ্ধ বিভাস, সে বলল, 'আমাকে বলল, 

'আমি! আমি ঐ যে ঐ বাড়ির মেয়ে গো, নাম দুগ্গা!'... বলতে বলতে চোখে জল তারও।


 বিষণ্ণ হয়ে ঘরে এল বিভাস। ঝড় বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে সব, তারই মাঝে প্রতিমার বায়না এল তার কাছে একদিনে পাঁচটি। উঠোনটা ঢেকে কাজ শুরু করতে যেতেই মাথাটা ঘুরছে বলে বসে পড়ল বিভাসের স্ত্রী মালা। পাশেই এক ডাক্তার ছিলেন, তার কাছে নিয়ে গেল বিভাস।

 ভালোভাবে চেক করে মালাকে বললেন, 'ভয়ের কিছু নেই, মা হবে তুমি!'

 বিভাস বিড়বিড় করে বলে উঠল, 'দুগ্গা আসছে আমার ঘরে!'


স্মৃতির ঝাঁপি - অনুপ কুমার বনিক

পূজো আমার

ছেলেবেলার - চুরি করে রাখা

স্মৃতির রংচটা তোরঙ্গ।

মরচে পড়া তালা

ক্যাচোর ক্যাচ্ শব্দ করে

খুলে পড়ে 

ঢাকের কাঠির বোলে ।

শীত শীত করা -

ভোরের মিঠে হাওয়ায়,

সকালের রূপোলি

শিশিরের ছোঁয়ায়,

ডালা খোলে তার ।

একরাশ তাজা হাওয়া,

বেরিয়ে এসে-

আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়,

বাঁশ আর টিনের মন্ডপে ।

বুকের উপর 

দু'হাত আড়াআড়ি করে

গোল গোল স্বপ্নীল চোখে দেখি

পাল কাকু তাল তাল মাটি দিয়ে

গড়ছে  দূগ্গামা  ।

নাক সির সির করা 

মাটির সোঁদা গন্ধে-

আজও মনের রন্ধ্র বেয়ে উঠে আসে -

এক মায়াবী আবেশ ,   

ঠেলে দেয় 

এক ভালো লাগার শৈশবে ।

ফিরে যেতে আবার ইচ্ছে করে

পূজোর সকালে-

যখন গায়ে তেল মাখিয়ে

স্নেহমাখা হাত দুটো

নাইয়ে দিতো জোর করে ;

নতুন কাপড় পরিয়ে ,

অঞ্জলি দেওয়াতো-

আরেক মায়ের পায়ে

ভাব ভরে।

 কখনো টানা বারান্দায়

পাত পেড়ে খাওয়া -

অগ্রজার মেখে দেওয়া গ্রাসে। 

ধূনুচির ধোঁয়ায় ঢাকের ছন্দে

রাতের পেট্রোম্যাক্সের আলোয়

ছলছলে মায়ের চোখ  

নবমীর রাতে।

এখনো যত্নে লালিত  হয়-

মনের  গহনে ,

বিজয়ার প্রণামে হুড়াহুড়ি আর

ধুতি পরা পা দুখানি ,

এক নিশ্চিত ভরসার ঠিকানা,

জীবনের উত্তাল সমুদ্রে ।

Kalpography ( photography and Drawing Dept. Of Mrittika )

Click On " Shiulibela Web Magazine " to see the complete magazine -
Shiulibela Web Magazine - Photography and Drawing Dept.

প্রচ্ছদ এবং সম্পাদকীয় কলমে

  দোল দিয়ে যায় কাশের বনে আশ্বিনের হিমেল হাওয়া শিশির ভেজা শিউলি বেলা বছর ঘুরে ফিরে পাওয়া। বোধন হতে নিরঞ্জন - ভেদ হীন এক ঐক্যতান, ঢাকের বো...