সুসজ্জিত ফ্ল্যাটের সামনে নেমপ্লেটে লেখা আছে "লালন মুখার্জী,অদিতি মুখার্জী"।পুলিশ অফিসার দরজায় নক করতেই দরজা খুলে গেলো।বয়কাট চুল,বড়বড় টানা দুচোখ,ডিমালো গড়নের মুখ,লম্বা,ছিপছিপে চেহারার অদিতি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
" আরে,রঞ্জিত না?তুই এখানে,কি মনে করে?"অদিতি অবাক।
"তুই?অদিতি,তুইই বা এখানে কেন?" রঞ্জিতেরও একই অবস্থা।
"আরে,এটা তো আমারই ফ্ল্যাট।এখানে আমি আমার হাজব্যান্ডের সাথে থাকি।"
"ও মাই গড!তার মানে লালন মুখার্জী তোর বর? এই মানুষের জন্যই তুই বাড়ি থেকে পালিয়েছিলি?"রঞ্জিত সামান্য হাসে।
অদিতি দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বন্ধুকে আহবান জানায়," হ্যা।আয়, আয়,তুই ঘরে এসে বোস।"অদিতি রঞ্জিতকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে,সামান্য উঁচুস্বরে লালনকে ডাকে,"এই শুনছো,একটু এদিকে এসো।"
রঞ্জিত সোফায় বসতেই লালন ভেতরের ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে, অদিতি তার কলেজের সহপাঠী রঞ্জিতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। রঞ্জিত একটু অস্বস্তি বোধ করে কেননা ও একটা তদন্তে এখানে এসেছে। আসার আগে পর্যন্ত জানতো না এটা তার এককালীন বান্ধবীর ফ্ল্যাট।
"আসলে আমি একটা অফিসিয়াল ব্যাপারে ইন্সপেকশন করতে এখানে এসেছি।"রঞ্জিত সময় নষ্ট না ক'রে বলেই ফেলে।
লালন তার দীর্ঘ,গৌরবর্ণ সুঠাম পুরুষালি চেহারা কাঁপিয়ে হোহো করে হেসে ওঠে,"আই থিংক আই নো এবাউট ইয়োর ইন্সপেকশন। ইফ আই এম নট রং ইটস অল এবাউট মাই সো কল্ড রিলিজিয়ন।এম আই রাইট? "
"নো,ইউ আর এবসলুউটলি কারেক্ট। আসলে ওপরমহল থেকে এব্যাপারে তদন্তের ভার পড়েছে এই অধমের ওপর।"রঞ্জিত সামান্য হলেও অস্বচ্ছন্দ বোধ করে,হাজার হোক কলেজে পড়ার প্রথম দুবছর অদিতি তার সহপাঠী ছিল।
"কেন,অনেকেই তো চাকরিবাকরি করেও ব্যবসা করে,অনেকে শিক্ষকতা করেও টিউশনি করে।এতে তো কোন সমস্যা নেই।আসল ব্যাপার হচ্ছে "ধর্ম"ঘটিত,তাই তো?ওতো কিন্তু কিন্তু করছেন কেন? বলে ফেলুন যা বলতে এসেছেন।এই অদিতি,তোমার ফ্রেন্ডকে এসে দেখো।এই প্রফেশনে এতো সফট মাইন্ডের লোক,ভাবাই যায়না।"লালন রঞ্জিতের মুখোমুখি বসে।
অদিতি কিচেনে কিছু করছিল,লালনের ডাকে ট্রে হাতে ড্রইংরুমে আসে। দুটো প্লেটে কয়েকটা মিষ্টি আর চানাচুর, সাজিয়ে রঞ্জিতের হাতে একটা প্লেট আর একটা লালনের হাতে তুলে দিয়ে নিজেও সোফায় বসে,"কি ব্যাপার রঞ্জিত,এনিথিং আর্জেন্ট? "
"আমার মনে হয় পাড়ায় দুর্গাপূজোয় আমার পৌরোহিত্য নিয়ে কিছু বিরুদ্ধমতের লোকজন থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছে।কি,ঠিক তো?
"একদমই ঠিক।আসলে এতোদিন অনেকেই আপনার সঠিক পরিচয় জানতো না, এখন জানার পরে তারা আপত্তি তুলেছে অথচ আপনি নিজের অবস্থান থেকে সরতে চাইছেন না। কারণ জানতে পারি?" রঞ্জিত লালনের কাছে সরাসরি প্রশ্ন রাখে।
"পূজো কমিটির লোকেরা এসেছিল তাদের ভুল সংশোধনের জন্য।এই নিয়ে আমার সাথে কথা কাটাকাটিও হয়েছে তবে এরজন্যে যে তারা থানাপুলিশ করবে এটা আমি ভাবিনি।আসলে জন্মসূত্রে আমার দাদু মানে মায়ের বাবা মসজিদের ইমাম ছিলেন,এদিকে আমার বাবা খাঁটি ব্রাহ্মণের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই মন্দির-মসজিদ দু-জায়গাতেই গিয়েছি বাবা-মায়ের হাত ধরে।আর আমার ঠাকুর্দা অধ্যাপক হলেও খুবই গোঁড়া মানুষ ছিলেন। বাড়ির পূজো অর্চনায় নিজেই পৌরোহিত্য করতেন।বুঝতেই পারছেন বাবা-মায়ের বিয়ে প্রেমঘটিত।প্রথমে ঠাকুর্দা মাকে মেনে না নিলেও পরে মায়ের আচার ব্যবহারে বেশ কিছুটা নরম হন তবে পূজো আচ্চায় মায়ের ভূমিকা ছিল শুধুই দর্শকের।বড় হয়ে এসব বিধিনিষেধের ব্যাপার বোঝবার আগেই ঠাকুর্দা মারা যান।মারা যাওয়ার আগে ঠাম্মি আর বাবাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করান যেন বাড়ির পূজোয় মা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ না করে।মা, বাবাকে জিজ্ঞেস,করে জানতেও চেয়েছিলেন,সহধর্মিণীর প্রকৃত অর্থ। বাবা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে গম্ভীর কন্ঠে বলেছিলেন,"পিতা স্বর্গ,পিতা ধর্ম,পিতাহি পরমং তপ।যে মানুষটা আজীবন তার নিজস্ব বিশ্বাসে আস্থা রেখে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে যাতে সে-ই বিশ্বাসের অন্যথা না হয় তারই প্রতিশ্রুতি চেয়েছে তার একমাত্র পুত্রের কাছে,সেটা না রাখলেও যে মানসিক যন্ত্রণা পাবো।তুমি যদি প্রকৃত সহধর্মিণী হও,এটুকু না বোঝার কিছু নেই।"ঠাম্মি গত হলেও বাবা এখনো সেই পরম্পরা বজায় রেখে চলেছেন।মা এই নিয়ে আর কিছু অভিযোগ করেনি।কিন্তু এই নিয়েই আমার সাথে বাবার মতানৈক্য ঘটে,আমি পৃথক ফ্ল্যাটে থাকা শুরু করি তবে বাড়িতে যাতায়াত আছে। আসলে ছোটবেলা থেকেই ঠাকুর্দার সুললিত কন্ঠে মন্ত্রোচ্চারণের আওয়াজে ঘুম ভাঙতো।আবার ছুটিছাটায় দাদুর কাছে গেলে কোরানের সুরা শুনে মুগ্ধ হতাম। এভাবেই কখন যে উর্দু,সংস্কৃত দুই ভাষার প্রতিই এক অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি হয়ে গিয়েছে, তারপর কলেজে কেমিস্ট্রি নিয়েই অনার্স পাশ করলাম, কলেজ থেকে বেড়িয়ে মাস্টার্স করতে অদিতির কলেজে ঢুকলাম।ক্রমে অদিতির সাথে আলাপ পরিচয়।" একটানা বলে লালন থামে।
"বুঝলাম।কিন্তু অনেকেই এখন আপনার প্রকৃত পরিচয় পেয়ে মন্ডপের পূজোতে আপনার পৌরোহিত্যে আপত্তি করছে।এটা আপনি ঠিক করছেন না। পৌরোহিত্য ছাড়া পূজোর অন্য যে কোনো কাজেই আপনি পার্টিসিপেট করতে পারেন।"
লালন উত্তেজিত হয়ে বলে,"বেঠিক কেন? অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো হিন্দুশাস্ত্রমতে পূজো হয়, আবার তার সাথে পঁচিশে ডিসেম্বর চার্চের যীশুকেও পূজো করা হয়,ওদিকে মাজারে যেতেও বাধা নেই।আর আমি তো জন্মসূত্রেই হিন্দুও আবার মুসলমানও।অসুবিধে কোথায়? ইফ ইউ ওয়ান্ট টু চেঞ্জ দিস সোসাইটি,ফার্স্ট চেঞ্জ ইয়োরসেল্ফ।"
রঞ্জিত জলের গ্লাস নামিয়ে রাখে, "ঠিকই বলেছেন,ফার্স্ট নিজেকে,নিজের পরিবারকে বদলাতে হয়।সেটা কি আপনি পেরেছেন?এক্ষুনি আপনার মুখেই নিজের বাবার কথা শুনে তা তো মনে হোলোনা।তাছাড়া,একটা ব্যাপারে আপনি একটু গুলিয়ে ফেলছেন। মন্দিরে পুরোহিত,মসজিদে ইমাম, গীর্জায় ফাদার ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের পৌরোহিত্যর অধিকার আজও সেভাবে চালু হয়নি,আর দুর্গাপূজোটাও হিন্দুদের কাছে আবেগের ব্যাপার।যখন সমাজ আপনা থেকেই বদলাবে তখনই নাহয় এসব ভাবা যাবে।"
"জানিস রঞ্জিত, ওর ভরাট গলার আবৃত্তি শুনেই আমি ওর প্রেমে পড়ি। কর্পোরেট অফিসে কাজ করলেও আবৃত্তি ওর প্যাশন।তুই তো জানিসই বাবা মারা যাওয়ায় আমি আর মা মামাবাড়িতেই থাকতাম।মামা আমার সাথে লালনের প্রেমের ব্যাপারটা কোনদিনই মন থেকে মেনে নেয়নি।বাধ্য হয়েই রেজিস্ট্রিম্যারেজ করেই বিয়ে হয়।অবশ্য ওদের বাড়িতে কিছু ঘনিষ্ঠ মানুষকে নিমন্ত্রণ করে একটা পার্টি দেওয়া হয়।আমার মা গতবছরেই মারা গিয়েছে,লালনের মা বাবা সল্টলেকে পৈতৃক বাড়িতেই থাকে।আমাদের একমাত্র ছেলে,যীশু নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ক্লাশ সিক্সে পড়ে।"অদিতি রঞ্জিতকে এপর্যন্ত বলে উঠে দাঁড়ায়,"একটু বোস,চা আনছি।'
অদিতি চলে যেতেই লালন গেয়ে ওঠে,"বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ,বামনী চিনি কেমনে!"।রঞ্জিতের অস্বস্তি হয়,সে নিজেও মন থেকে লালনের এই পূজো করাটা মেনে নিতে পারছে না।
"মুখে প্রগতিশীল হতে সবাই পারে, কিন্তু মনে?এ দেশে এখনো ধর্ম নিয়ে রাজনীতি চলে আর আপনাদের মতো আইনরক্ষক নেতাদের কথায় চলেন। কেন জনসাধারণকে বোঝাতে পারেননা ' সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই।'এবছরেই প্রথম দুর্গাপূজোয় পৌরোহিত্য করার কথা হয়েছিল। সেটাও অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে চলেছে। আসলে আপনিও চাননা আমি পূজোর মন্ত্রোচ্চারণ করি।অথচ বহু অনুষ্ঠানে আমার পুরুষালী কন্ঠের স্তোত্রপাঠে উপস্থিত শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শোনে, আমারও কেমন যেন নেশায় ধরে, সেসময় নিজেকে চিনতে পারিনা। ঠাকুর্দা যেন আমার ওপর ভর করে, আমি একের পর এক সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চস্বরে বলে যাই।সেই আমি কি মিথ্যে আমি?"লালন স্পষ্টতই হতাশ।
"অনুষ্ঠানে তো কেউ আপত্তি করছে না।কিন্তু--।"রঞ্জিত কথা শেষ না করেই থামে।
লালন বিদ্রুপের সুরে বলে,"পূজোও ধর্মীয় অনুষ্ঠান-ই।"
"ওই যে বললেন,'ধর্মীয়'!এই নিয়ে আর ঝামেলায় যাবেন না।"
অদিতি চায়ের টিপট আর কাপ নিয়ে ফিরে আসে,চিনির পরিমাপ জেনে নিয়ে দুজনকে দিয়ে নিজেও এককাপ নিয়ে বসে,"রঞ্জিত,তুই কি চাস?"
"কমিটির মেম্বাররা যখন চাইছে না তখন এ ব্যাপারে আর না এগোনোই ভালো।প্রশাসন কোন রিস্ক নেবেনা, এরপর সাংঘাতিক কিছু হয়ে গেলে থানাপুলিশ করে কিছু লাভ হবেনা। এখন পাব্লিক একটুতেই আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে,সাবধানে থাকাই উচিত।হাতে এখনো একমাস সময় আছে,ভেবে দেখুন।আজ উঠি।"রঞ্জিত লালনকে নমস্কার করে অদিতির দিকে সামান্য হেসে ফ্ল্যাট ছাড়ে।
অদিতি দরজা বন্ধ ক'রে লালনের পাশে এসে বসে,"এবার?"
লালন অদিতির কাঁধে হাত রাখে "ঘরে-বাইরে বদল তো হচ্ছেই,বাবার থেকে আমি, এরপর হয়তো আমার ছেলেও--!এখন তুমি যা বলবে তাই হবে।অযথা ভয়ে ভয়ে বাঁচার জন্য তো সংসার পাতিনি।"
অদিতি লালনের দিকে ফেরে,পূর্ণদৃষ্টিতে চায়,"জীবনভোর একঘরে থাকতে ক্লান্ত লাগে,তারচেয়ে অপেক্ষায় থাকি। তোমাকে নিয়েই আমার স্বপ্ন,কোন মূল্যেই আমি তোমাকে হারাতে চাইনা। বরং তোমাকে যে অডিও কোম্পানি যোগাযোগ করতে বলেছিল,তাদের সাথে যোগাযোগ করো।"
"যথা আজ্ঞা,মহারানী,আপনার কথাই শিরোধার্য।"লালন মুচকি হাসলো।
সেবারেই বহু পূজোমন্ডপে বিখ্যাত রেকর্ডিং কোম্পানি থেকে প্রকাশিত লালন মুখার্জীর সুগম্ভীর কন্ঠে স্তোত্রপাঠ গমগম করে বাজতে শোনা গেলো।রাতের আলোয় যীশুর হাত ধরে দুর্গাঠাকুর দেখতে বেড়িয়ে লালন অদিতির দিকে তাকিয়ে বলে,"ভাগ্যিস বুদ্ধিটা দিয়েছিলে!!এভাবেও অস্তিত্ব জানিয়ে শারদাঞ্জলি দেওয়া যায়।"