20_10

দুগ্গা - নন্দিতা মিশ্র

সরকার যদিও ঘোষণা করে দিয়েছে এ বছর নির্দিষ্ট নিয়ম বিধি মেনে পুজো হবে।  তবু প্রতিমার বায়না দিতে মানুষের সমাগম নেই। রথের পর থেকেই ভীড় লাগে মানুষের। কত পুজো কমিটিকে ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য হন কুমোরটুলির বিশিষ্ট মৃৎশিল্পী বিভাস পাল। কিন্তু এবারে কেউ আসছেই না।

 কুমোরটুলির এক পাশে ডাই করে রাখা মাটিগুলো যেন তার হাতের পরশ না পেয়ে ব্যথাতুর। তার মাঝে এবারে যেন বৃষ্টি, বৃষ্টি আর বৃষ্টি। নিম্নচাপের পর নিম্নচাপ। বারিধারার নিরবচ্ছিন্ন বর্ষন প্রতিমার জন্য রাখা মাটিগুলোকে কাঁদিয়ে ছাড়ছে বারবার।

 বিভাস পাল তথা কুমোরটুলির মানুষদের

বারোমাসের খরচ এই একমাসেই তুলতে হয়। কি হবে, না-হবে কে জানে এবার, একে এমন বিপর্যয় তাতে, বাজার যা' তুঙ্গে তাতে এ'বছর বুঝি আর প্রতিমা গড়া হলো না। 


 মনের মধ্যে একটা বিকার জেগে ওঠে বিভাসের। মাঝরাতে ঘর থেকে এসে বসে গঙ্গারধারে। অতীত ও ভবিষ্যতের মেলবন্ধন রচনা করতে করতে কখন ঘাটের সিঁড়িতে পাণ্ডাদের চালাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে, বুঝতেই 

পারেনি।

ভোরের শীতল হাওয়ার সাথে, পায়ে একটা নরম হাতের ছোঁয়া পেয়ে ঘুম ভাঙ্গল।

কী কাণ্ড গঙ্গা তো ফুঁসছে! সারা কোলকাতা বুঝি ভাসিয়ে দেবে। ভাগ্যিস... ছোট্ট মেয়েটা ডেকে দিয়েছিল।

 তাকিয়ে বলল বিভাস, 'কে তুমি?'

 'আমি! আমি ঐ যে ঐ বাড়ির মেয়ে গো, নাম দুগ্গা!'

 'এত সকালে তুমি কেন একা নদীর ধারে এসেছো? যদি কোনো বিপদ হয়, চলো আমি ছেড়ে দিয়ে আসি বাড়িতে।'

 'আমাকে তো সেই কবেই ছেড়ে দিয়েছে সবাই। তুমি আমার কথা ভেবো না। আজ ঝড় আসবে গো! সবাই বলছে সে ঝড়ের নাম 'গতি'... তুমিও নইলে ডুবে যাবে। তুমি বাড়ি যাও, তোমার প্রতিমাগুলোকে ঢাকতে হবে তো! দেখছ না কালো মেঘ...'

 অবাক হয়ে আকাশে তাকিয়ে দেখল প্রচণ্ড ঝড় আসবে বলে সেজে উঠেছে প্রকৃতি, গঙ্গার জলে নিম্নচাপের রেশ। ছলাৎ ছলাৎ করে ঘাটে এসে আছড়ে পড়ছে। সেদিকে তাকিয়েই নিজের মনেই বলে উঠল, 'এবারে যে একটাও বায়না পাইনি রে মা! কোন প্রতিমা ঢাকব আর! ঘন বিপর্যয় নেমে এসেছে এ দুনিয়ায়।'

 'এত কথা আমি কইতে পারব না বাপু, তুমি বাড়ি যাও, আমিও বাড়ি যাই...' 

 দুগ্গার কথায় বিভাস উঠে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। কী মনে হলো ঘুরে তাকিয়ে দেখল, দুগ্গা সিঁড়ি দিয়ে জলে নেমে যাচ্ছে। চিৎকার করে উঠল, 'ডুবে যাবি, ওদিকে যাস না!'

 ওর চিৎকারে আশপাশের বাড়ি ঘর থেকে লোকেরা এসে জড়ো হয়েছে। এ বছর সবারই একই দশা, সেভাবে কেউ কোনো বায়না পায়নি। শ্রাবণ শেষ প্রায়। 

 পাশের বাড়ির হরি খুড়ো বলল, 'কাকে ডেকে চিৎকার করছিস বিভাস! কেউ নেই তো!'

 বিভাস আঙ্গুল তুলে বলল, 'দুগ্গা জলে নেমে যাচ্ছে, ওই দেখো। ওকে ধরো, তোমরা সবাই ধরো! ও ডুবে যাবে...'

 ততক্ষণে নিমাই পাল এসে হাজির। তাকে জোরে ঝাঁকিয়ে বলল, 'কী বলছ তুমি? কোন দুগ্গা?'

 'ওই যে গো! মিষ্টি হাসছে আর নেমে যাচ্ছে, ধরো... 'ওই তো আমাকে বলল, 'ঝড় আসছে ঘরে যাও, তুমিও ডুবে যাবে... প্রতিমা সামলাও...'


 ততক্ষণে কালো মেঘ ও ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে গঙ্গার তীরে টেকা যাচ্ছে না। দুগ্গাকে জলে নামতে না দেবার জন্য দৌড়ে গঙ্গার দিকে নামতে যাচ্ছে, সবাই চেপে ধরেছে তাকে। বিভাসের স্ত্রী মালাও ছুটে এসে। বৃষ্টিও এল মুষলধারে। এক কথায় টানতে টানতে তাকে নিয়ে এসে বসানো হলো সামনের চাতালে। 

 বিভাস সমানে বলে চলছে, 'দুগ্গাটা জলে ভেসে গেল। ওকে বাড়িতে আনো।'


 নিমাই এর চোখে জল। অনেকটা সময় চুপ করে থেকে বলল, 'দুগ্গা বহু বছর আগেই ভেসে গিয়েছে বিভাস। তখনো তোমরা এখানে আসোনি। এমনই শ্রাবণ শেষে আমি অন্ততঃ পাঁচটা প্রতিমা গড়ার বায়না পেয়েছিলাম। আমার বাড়িটা তো গঙ্গার ঠিক পারেই, আমি প্রতিমা গড়ছিলাম এক মনে। হঠাতই নিম্নচাপের ঘোষণা হলো। পাঁচটা প্রতিমারই শরীরের কাজ আমার শেষ। হঠাতই মুষলধারে বৃষ্টি। আমার ছোট্ট মেয়ে দুগ্গা ঘরের চাতালে বসে দেখছিল আমার কাজ। বলল, 'বাবা, দ্যাখো নদীর জল কেমন সিঁড়িতে ছলাৎ ছলাৎ করে পড়ছে। আমি হাত দিয়ে দেখব।' মেয়েকে নিষেধ করলাম, 'না, এখন মা গঙ্গা ফুঁসছে, এখন গঙ্গার কাছে যেতে হয়না।' দুগ্গা চুপ করে দেখতে লাগল, গঙ্গার জলকেলি।

আমি আর গঙ্গার মা প্রতিমা ঢাকতে ব্যস্ত। কখন যে দুগ্গা গুটি গুটি পায়ে নেমে গেছে গঙ্গার সিঁড়িতে, প্রতিমা ঢাকতে গিয়ে দেখতেও পাইনি আমরা। যখন দেখলাম তখন দুগ্গা গঙ্গার জলে শেষ পাটা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিধ্বংসী গঙ্গা সাথে সাথেই টুপ করে কোলে তুলে নিল আমার দুগ্গাকে, আমাদের দুগ্গাকে। মৃন্ময়ীকে সামলাতে গিয়ে চিন্ময়ী মায়ের আমার শ্রাবণ শেষেই বিসর্জন হয়ে গেল। এমনই এক ঝড়ে আমাদের ছেড়ে গিয়েছিল সে, হয়তো তোমাকে বাঁচাতেই ফিরে এসেছিল। তাই শুধু তুমিই দেখেছ, আমাদের একবার দেখাও দেয়না হতভাগী! ওকে যে বাঁচানোর চেষ্টা করিনি আমরা, আমরা বায়না করা প্রতিমাই বাঁচিয়ে চলেছিলাম...' বলেই হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

 বাকরুদ্ধ বিভাস, সে বলল, 'আমাকে বলল, 

'আমি! আমি ঐ যে ঐ বাড়ির মেয়ে গো, নাম দুগ্গা!'... বলতে বলতে চোখে জল তারও।


 বিষণ্ণ হয়ে ঘরে এল বিভাস। ঝড় বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে সব, তারই মাঝে প্রতিমার বায়না এল তার কাছে একদিনে পাঁচটি। উঠোনটা ঢেকে কাজ শুরু করতে যেতেই মাথাটা ঘুরছে বলে বসে পড়ল বিভাসের স্ত্রী মালা। পাশেই এক ডাক্তার ছিলেন, তার কাছে নিয়ে গেল বিভাস।

 ভালোভাবে চেক করে মালাকে বললেন, 'ভয়ের কিছু নেই, মা হবে তুমি!'

 বিভাস বিড়বিড় করে বলে উঠল, 'দুগ্গা আসছে আমার ঘরে!'


প্রচ্ছদ এবং সম্পাদকীয় কলমে

  দোল দিয়ে যায় কাশের বনে আশ্বিনের হিমেল হাওয়া শিশির ভেজা শিউলি বেলা বছর ঘুরে ফিরে পাওয়া। বোধন হতে নিরঞ্জন - ভেদ হীন এক ঐক্যতান, ঢাকের বো...