দেবাঞ্জন এখন স্মৃতি শক্তি হারিয়ে শুধু আপন মনে বলে যায় ----জ্ঞানের আলোয় ধর্মের বইয়ের পাতা উল্টে দেখছি । আর ঝরঝর করে চোখের জল পড়ে ! ওর লেখা কাহিনী---জ্যোতি আমার জ্যোতি
সেদিন পারিনি --পারিনি তোমাকে রক্ষা করতে ! ঐ যে ওরা পিছন থেকে মেরে তোমার মাথা চৌচির করে দিল । তুমি সঙ্গে সঙ্গে অতর্কিতে পড়ে গেলে ! চোখ দুটো খোলা ! এ যে স্বপ্ন দেখা সেই অপলক দৃষ্টি ,বিস্ময়ে তাকিয়ে আছো ; রক্তে লাল হয়ে গেল তোমার সিঁথির রেখা । একরাশ ঘন কালো চুল দিয়ে বয়ে গেল রক্ত গঙ্গা ! আমি লুকিয়ে ভাঙা বাড়ির পিছন থেকে দেখছি । তোমার নিজের রক্তের সম্পর্কের মানুষ এই নৃশংস হত্যালীলা চালালো শুধু ভিন্ন জাতে বিয়ে করার জন্য ! ওরা আমার নাম ধরে অশ্লীল গালি দিতে লাগল । তোমাদের গ্রামে কোনো লোক প্রতিবাদ করতে এলো না । বিশাল লোকের ভীড় ,চীৎকার কোলাহল ! আমার সাহস হোলো না সামনে আসতে । ওরা যে আমাকেও শেষ করে দেবে !
তুমি তো জানো -----আমি ছাড়া আমার বাবা মায়ের কেউ নেই ! বাবা অন্ধ ! সবকিছু তাকে করে দিতে হয় । গ্রামের সবকিছু বিক্রি করে শহরে চলে আসা ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে আমার লেখা পড়া । তারপর চাকরি ,তোমার সাথে আলাপ প্রগাঢ় বন্ধুত্ব সর্বশেষ প্রেমের ভালোবাসা ! তারপর তোমার সাহসে আমাদের বিয়ে ! আমি জানতাম বাঙালি অবাঙালি জাতপাতের ব্যাপার চলে আসবে । আমি প্রকৃতিগত চুপচাপ শান্ত । ভয় দ্বিধা দ্বন্দ সর্বদা আমার জীবনে গ্রাস করেছে । তাই আমি তোমার মতো প্রাণচঞ্চল ছিলাম না । তুমি আমার জীবনের লাঠি হয়ে গেলে। স্বভাবের পার্থক্য আমাদের দুজনকেই কাছাকাছি নিয়ে এলো ।
তুমি আমাকে কয়েক মাসে সব পার্থিব সুখ শান্তি দিলে । বাবা মাকে নিয়ে বেশ সুখ শান্তিতে দিন কাটলো । হঠাৎ সব মেনে নিয়েছি আমরা---- বলে ফোন ,তারপর বাড়িতে আমন্ত্রণ আসার জন্য । তুমি বুঝতে পারোনি ----তোমার আপনজনেরা ঠান্ডা মাথায় আমাদের হত্যা করবে বলে আমন্ত্রণ জানিয়েছে । আমরা কি বোকা ! আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমরা সকলের জন্য শপিং করতে গেলাম । তুমি তোমার দাদা ভাই বাবা কাকার জন্য পছন্দ করে কুর্তা পায়েজামা কিনলে । বাবার জন্য রূপোর পানের বাক্স কিনলে ,তোমার কি আনন্দ চোখে মুখে তারপর ! সব আপনজনকে ছেড়ে চলে এসেছিলে আমার কাছে বিবাহ বন্ধনে ,আমার খুব কষ্ট হতো তোমার জন্য । ঈশ্বরকে ডাকতাম ----সব ঠিক করে দেওয়ার জন্য ।
তুমি এতো ভালো মনের মানুষ ----তোমার এই মানসিক টানাপোড়েন আমাকেও খুব কষ্ট দিতো । তাই আমি সবটুকু দিয়ে তোমাকে আগলে রেখেছিলাম । কিন্তু ঐ ফোন কল সব কিছু এলোমেলো করে।দিলো । কি নিখুঁত পরিকল্পনা করে আমাদের শেষ করে দেওয়ার ছক কষেছিল । তুমি আতা গাছ থেকে আতা পারছিলে ----আমি একটু প্রকৃতির ডাকে ভাঙা বাড়ির ভিতরে গিয়েছিলাম । ভিতর থেকে হঠাৎ কোলাহলের আওয়াজ পেলাম -----ওরা বড়ো বড়ো পাথর লাঠি হাতে এগিয়ে আসছে । আমি দূর থেকে দেখলাম ! সামনে যাওয়ার সাহস ও মনোবল কোনোটাই আমার ছিলো না । তোমার নিজের লোকজন উল্লাসে মত্ত হয়ে মেরে তোমাকে মাটিতে ফেলে দিলো ।
আমি শিউরে উঠলাম -----এইবার আমার পালা ! কে যেন আমাকে হাত টেনে ধরে রেখেছে ,কিছুতেই তোমার কাছে যেতে পারলাম না । তুমি তাকিয়েছিলে ,হয়তো আমাকে খুঁজেছিলে শেষবারের মতো । আমি যেতে পারি নি ! ওরা তোমার রক্তাক্ত প্রাণহীন দেহ উল্লাস করে পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল । আমার আর খোঁজ নিতে ভুলে গেছে সবাই !
পরমেশ্বর আমাকে রক্ষা করলেন ! আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না এই নৃশংসতা ! কিন্তু কিভাবে প্রতিশোধ নেব ? অতি কষ্টে দ্রুততার সঙ্গে ফিরে এলাম । কাগজে শিরোনাম হলো ঘটনা । মিথ্যা বিবরণ দিয়ে লেখা ! আমি আর জড়াতে চাইলাম না । কিছু দিনের মধ্যে বাবা মা দুজনেই ইহলোক ছেড়ে চলে গেলেন !
আমি নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছি না । যদি আমি নিষেধ করতাম ! তাহলে ও সম্পূর্ণ ভুল বুঝতো । আমি চাকরি ছেড়ে এখন বিবাগী হয়ে গেলাম। আজও খুঁজে যাই আমার ধর্মের বইএর লেখা -----কোথায় আছে জাত ধর্ম বর্ণের বিভেদের কথা ! সেই স্বর্গীয় আলোয় অবিরাম আজও খুঁজে যাই বইয়ের পাতায় মনুষ্যত্বের কথা মানবতার কথা !
"প্রিয়ারে আমার কেড়েছিস তোরা ,নিজ আপনার জনেরা !"শুধু বইটি আগলে রাখে আলোলিকার আলোয় জ্যোতি যে আছে ওখানে !
--------------
©Shipra.