20_10

দুর্গার চিঠি - দলছুট পাখি

কেমন আছো বাবা? মায়ের শরীরটা আগের থেকে ভালো আছে তো?

বছর ঘুরে ঘরের উমা আবার বাপের বাড়ি চললো।

কয়েক বছর হয়ে গেল আমার বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ।

আর এজন্মে কখনো যাওয়া হবে কিনা জানিনা।


শ্বশুর বাড়িতে আমি খুব ভালোই ছিলাম ।

এত ভালো ছিলাম তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

তোমার জমিতে এবার কেমন চাষ হলো? দাদারা তোমাকে এখন মাঠের কাজে সাহায্য করে তো?

বড়দা চিরকাল সাহেবি মানসিকতার মানুষ,

ওকে কখনো জোর কোরো না মাঠে যাবার জন্য।


জানি এই চিঠি পড়ে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে।

আমি সব বুঝি বাবা।

সেবার ছোড়দার কলেজে ভর্তির টাকা আর বন্ধকি জমিটা না ছাড়াতে পারলে সত্যি তোমাদের সেদিন সবাইকে রাস্তায় দাঁড়াতে হতো।


অনেক বড় মনের মানুষ আমার শ্বশুরমশাই। 

সেদিন তোমাকে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়ে এলেন আমায় নিজের বড় ছেলের বউ করে।

পনেরো বছর বয়সে কিই বা বুঝতাম বিয়ের!

বিয়ের সময় স্বামীর মুখ মাত্র একবার দেখেছিলাম ঘোমটার ফাঁক দিয়ে।


বাসর রাতে...

না না বাবা তুমি ভয় পেয় না!

তোমার দুর্গা খুব ভালো ছিল সবার আদরে ছিল।

আমার শ্বশুর, স্বামী, তিন দেওর ওরা পাঁচজনেই খুব আদরে রেখেছিল আমায়।

পাঁচ লাখ টাকাটা কম নয়!

পাঁচ জনকে খুশি তো আমাকেই রাখতেই হতো।


প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হতো!

প্রায় সারা রাত জাগার পর সকালে উঠে বাড়ির সমস্ত কাজ করার সময়ও উঠোনের এদিক ওদিক পরে থাকতো রক্তের দাগ।

এখন আর সেসব কিছু হয় না।


ওরা আমাকে এখন একটা ভালো জায়গায় নিয়ে এসেছে।

দরজার আড়াল থেকে দেখেছিলাম দুটো লোক আমার শ্বশুরমশাইকে দশ লাখ টাকা দিল।

পাঁচ লাখের বিনিময়ে দশ লাখ কম কি বলো?

খুব খুশি দেখাচ্ছিল আমার স্বামী দেওরদের।


দশ লাখের বিনিময়ে তোমার দুর্গা এখন দশভূজা।

কিন্তু দশ ঘন্টা আমার হাতদুটো কোনো কাজ করে না জানো!

শুধু নিথর হয়ে পরে থাকে শরীরটা।

বাকি সময়টা নিজের হাতেই নিজেকে সাজাই বোধন থেকে বিসর্জনের জন্য।

ধূপ-ধুনো জ্বেলে, রঙিন আলোর সামনে বসি অঞ্জলি গ্রহণের জন্য।

প্রণামীও পাই ভালোই।


এবছর তোমার জন্য পাঞ্জাবি, মায়ের শাড়ি, দুই দাদার জন্য দুটো দামি হাতঘড়ি কিনেছি।

ভেবেছিলাম বাপের বাড়ি যাবে দুর্গা!

কিন্তু জানতো বাবা-

পুজোর এই পাঁচদিন এই জ্যান্ত দুর্গাকে ছোঁয়ার জন্য অনেক লোকের ভিড় হয়।

তাদের নিরাশ করি কি করে বলো?

দশ লাখের বিনিময়ে এই দুর্গাকে যারা কিনেছে তারা নিজের লোকসান কিছুতেই মানতে চায় না।


আমাদের মাটির বাড়িটা ভেঙে নিশ্চয়ই এতদিনে দালান তুলেছো?

পুজোর আগে মা যখন আমাদের মাটির দেওয়াল নতুন মাটি দিয়ে লেপত-

সেই গন্ধটা আমি ভীষণ ভালো বাসতাম। দেওয়ালে নাক লাগিয়ে জোরে জোরে গন্ধ শুঁকতাম।

এর জন্য কত বকা খেয়েছি মায়ের কাছে।


এখন আর সোঁদা মাটির গন্ধ আমার নাক পর্যন্ত পৌঁছায় না। 

তবে আমার ঘরের ধুলো নিয়ে যায় কত মানুষ।

এই ধুলো,মাটি ছাড়া নাকি প্রতিমা তৈরি হয় না!

সারা দুনিয়াতে এত মাটি থাকতে কিনা আমার ঘরের মাটিই ওদের প্রয়োজন।

খুব হাসি পায়।

মনে হয় আমি এত দিনে সত্যিকারের দশভূজা হতে পেরেছি।

তাই না বাবা?


দশ লাখের বিনিময়ে দশভূজা...

তোমার দুর্গা দশভূজা...


এবার তোমায় কথা দিলাম-

বিসর্জনের পর বাপের বাড়ি যাবো।


নিতে এসো গঙ্গার ঘাটে-

রক্তমাংসের শরীরের শুদ্ধতা নষ্ট হয় কিন্তু গঙ্গা মাটি মিশে থাকা ছাই তো শুদ্ধ...

তাই না?


বিসর্জনের অপেক্ষায় রইলাম-

এবার ঠিক বাপের বাড়ি যাবো।


আমায় নিতে এসো কিন্তু...



©দলছুট পাখি

@#champa sarder

প্রচ্ছদ এবং সম্পাদকীয় কলমে

  দোল দিয়ে যায় কাশের বনে আশ্বিনের হিমেল হাওয়া শিশির ভেজা শিউলি বেলা বছর ঘুরে ফিরে পাওয়া। বোধন হতে নিরঞ্জন - ভেদ হীন এক ঐক্যতান, ঢাকের বো...